সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে; এতে দেখা যাচ্ছে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিকে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তিনি একটি খয়েরি রঙের পোলো টি-শার্ট এবং ধূসর রঙের প্যান্ট পরে আছেন। তার চোখে চশমা রয়েছে এবং তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ছেন। তার বাম হাতে একটি স্মার্টফোনও দেখা যাচ্ছে। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, 'বরুড়ার সাবেক এমপি নজরুলের কারাগারে থাকা ছবি ভাইরাল'। এ ধরনের একটি পোস্ট দেখুন এখানে।
গত ১৩ এপ্রিল 'Prothom Cumilla' নামক পেজ থেকে এরকম একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, 'বরুড়ার সাবেক এমপি নজরুলের কারাগারে থাকা ছবি ভাইরাল' (বানান অপরিবর্তিত)। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, দাবিটি সঠিক নয়। প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয় বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুলের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে যে এটি কারাগারে তার বর্তমান অবস্থার দৃশ্য। তবে গুগলের SynthID শনাক্তকরণ টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
আলোচ্য ছবিটি রিভার্স সার্চ সহ বিভিন্নভাবে সার্চ করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ছবিটি পর্যবেক্ষণে কয়েকটি অসঙ্গতি পাওয়া যায়। যেমন: বই ধরে থাকা বাম হাতের আঙুলগুলো অস্পষ্ট এবং একে অপরের সাথে মিশে গেছে বলে মনে হচ্ছে, যা এআই-এর একটি সাধারণ ভুল।
ফলে ছবিটিকে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী একটি টুল দিয়ে আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। নিখুঁত ফলাফল, তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্যতা ও বিনামূল্যের হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই দিয়ে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরও উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন--
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পূর্ববর্তী কোনো বাস্তব দৃশ্যকে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন সংস্করণের হুবহু একই ছবি তৈরি করলেও এই ধরনের কনটেন্টকে এআই তৈরি কনটেন্ট এবং এই ধরনের কোনো কনটেন্টে কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত) বা ব্যক্তির উপস্থিতি সহ কোনো কাজকে নকল করার চেষ্টা করা হলে তা ডিপফেক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য হয়।
অর্থাৎ ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল কারাগারে বই পড়ছেন মর্মে যে ছবি প্রচার করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর।




