এআই ব্যবহার করে সম্পাদিত নদীতে ডলফিন দেখতে পাওয়ার ভিডিও গণমাধ্যমে
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীতে হঠাৎ ডলফিনের লাফ দেওয়ার দৃশ্য বলে প্রচারিত ভিডিওটি এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করে বলা হয়েছে শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীতে হঠাৎ ডলফিনের দেখা পাওয়া গেছে। ভিডিওটি নিজেদের ফেসবুকে প্রচার করেছে আরটিভি, গ্লোবাল টেলিভিশন, গণকণ্ঠ ও দ্য নিউজ।
গত ৬ সেপ্টেম্বর আরটিভি'র ‘Rtv News Live Update’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, 'শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীতে হঠাৎ ডলফিনের লাফ, মুগ্ধ নদীপাড়ের মানুষ’। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন --
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ভিডিওটি এআই দ্বারা সম্পাদিত। মূলত নদীর একটি আসল ভিডিওতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদনার মাধ্যমে ডলফিনের দৃশ্য যুক্ত করে আলোচ্য ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। ভিডিওটি গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে ডলফিনের দৃশ্যে 'গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ঐ ফ্রেমগুলোতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
আলোচ্য বিষয়ে সার্চ করে গত ০৬ সেপ্টেম্বর "কীর্তিনাশায় ডলফিনের লাফালাফি, ভিডিওটি ‘এআই’ বলছে মৎস্য কর্মকর্তা" শিরোনামে এশিয়া পোস্টের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দাসের একটি মন্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ... সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে তারও এআই দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়েছে। ...... ভিডিওতে প্রাণীটিকে যেভাবে এক পাশ থেকে অন্য পাশে বারবার লাফাতে দেখা যাচ্ছে, সেটি স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হচ্ছে না।
ফলে ভিডিওটি সিন্থেটিক কনটেন্ট ডিটেকশন টুলে যাচাই করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্য হওয়ায় এআই দিয়ে ভিডিও সম্পাদনা বা বাস্তবের ন্যায় নতুন ভিডিও তৈরি ক্ষেত্রে গুগলের ভিডিও জেনারেশন টুল 'Veo' বা ভিও'য়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। আর গুগলের জেনারেটিভ টুল তাদের কনটেন্টে 'SynthID' নামক এক ধরণের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা শোনা যায় না বা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
আলোচ্য টুলটির মাধ্যমে যাচাই করলে এটি ভিডিওতে ডলফিনের ফ্রেমগুলোতে 'SynthID' ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে। ফলাফলের কোলাজ দেখুন --
এখানে ভিডিওর নিচের সরল রেখা হলো প্রোগ্রেস বার (ভিডিওর ফ্রেম বার)। এই বারের যেই অংশটুকু নীল সেই ফ্রেমে এআই ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে আর সাদা অংশের ফ্রেমে পাওয়া যায়নি। প্রোগ্রেস বারের নিচে ওয়েভফর্মের (Waveform) ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াটি একইভাবে কাজ করে।
সিন্থআইডি টুলের ফলাফলের স্ক্রিনশট থেকে দেখা যাচ্ছে ভিডিওতে যেই ফ্রেমে (অংশে) ডলফিন দেখা গেছে সেখানে সিন্থআইডি ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে। সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওর (যদি খুব বেশি ম্যানুয়াল সম্পাদনা না করা হয়) পুরোটা অংশেই এআই ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়। ফলাফলের প্রোগ্রেস বারের কালার কোড অনুযায়ী যেহেতু এই ভিডিওতে একনাগারে অনেকগুলো ফ্রেমে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি তাই বলা যায় আসল একটি ভিডিওতে এআই দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে।
আসল ভিডিওর ফ্রেমের যেখানে এআই দিয়ে ডলফিনের দৃশ্য যুক্ত করা হয়েছে সেখানে ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে। যেখানে যুক্ত হয়নি সেই ফ্রেমগুলোতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি তথা আসল দৃশ্যটুকুই রয়ে গেছে। এআই দিয়ে তৈরি (সম্পাদনা নয়) ভিডিওর পুরোটা অংশেই এআই ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়, এমন একটি ভিডিওর ফলাফলের স্ক্রিনশট দেখুন --
আরেক সিন্থেটিক কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল 'হাইভ' দিয়ে মূল ভিডিওটি যাচাই করলে টুলটি ভিডিওটিকে ৭২.৫ শতাংশ সম্ভাব্য এআই জেনারেট (সম্পাদনাও জেনারেটেড ক্যাটাগরির আওতাধীন) ভিডিও বলে ফলাফল দিয়েছে। এই টুলটিও ফ্রেম বিশ্লেষণে ডলফিনের দৃশ্যের ফ্রেমগুলোকে এআই জেনারেটেড বলে ফলাফল দিয়েছে। আর ডলফিন দেখা যায়না এমন দৃশ্যের ফ্রেমগুলোকে আসল ভিডিও বলে ফলাফল দিয়েছে। দেখুন --
ডলফিন দেখা যায়না এমন দৃশ্যের ফ্রেমের ফলাফল দেখুন --
এআই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ 'Azahar Machwe' ভিডিওটির বিষয়ে বলেন, ডলফিনটি ভাসমান টগড়ের উপর আড়াআড়িভাবে লাফিয়ে পড়ছে এরপরে টগড় আর পানির উপরে উঠে আসেনি বরং অদৃশ্য হয়ে যায় যদিও ডলফিনটি উঠে এসে আবার আড়াআড়িভাবে লাফিয়ে পড়ে। এআই (AI) পানির সাথে ডলফিনের মিথস্ক্রিয়ার পদার্থবিদ্যাকে ভিডিওতে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারে না (অনূদিত)।
অর্থাৎ এআই দ্বারা ভিডিওটি সম্পাদনার মাধ্যমে ডলফিনের দৃশ্য যুক্ত করা হয়েছে।
সুতরাং গণমাধ্যমে এআই দ্বারা সম্পাদিত ভিডিও বাস্তব ঘটনার বলে প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




