সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফেসবুক পেজে একটি সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অভিনেতা ও সাংসদ দেবের (দেব অধিকারী) নামে ডাকটিকিট চালু করল ভারতীয় ডাকবিভাগ। সংবাদটি নিজেদের ফেসবুকে প্রচার করেছে বাংলাদেশ টাইমস, বিজয় টেলিভিশন, জনবাণী এবং অন্যধারা।
গত ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ টাইমসের 'Bangladesh Times - বিনোদন' নামক ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের পোস্টে উল্লেখ করা হয়, "দেবের নামে ডাকটিকিট চালু করল ভারতীয় ডাকবিভাগ"। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
খবরটি নিজেদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করেছে কালের কণ্ঠ, দেশ রূপান্তর, আলোকিত বাংলাদেশ, জাগো নিউজ, রাইজিং বিডি, দৈনিক করতোয়া ও খবর ডট কম।
অভিনেতা দেব নিজের ছবিসহ ডাকটিকিটের ছবিটি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে ইংরেজিতে লেখেন, "আমি অত্যন্ত সম্মানিত এবং অভিভূত। আমার নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করার জন্য 'ইন্ডিয়া পোস্ট'-কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। নিজেকে এমন সম্মানের যোগ্য বলে ভাবাটাও আমার কল্পনার অতীত। এই স্বীকৃতি যতটা মানুষ হিসেবে আমার জীবনযাত্রার, ঠিক ততটাই মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের। চিরকৃতজ্ঞ।" পোস্টটি দেখুন এখানে এবং পোস্টটির আর্কাইভ দেখুন এখানে।
ফ্যাক্ট চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। দেবের নামে ভারতীয় ডাকবিভাগের স্মারক ডাকটিকিট চালু করা হয়নি। এছাড়াও ভারতীয় ডাকবিভাগের পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের একজন দায়িত্বশীল জানিয়েছেন, ইন্ডিয়া পোস্ট দেব অধিকারীর ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে বলে তাদের কাছে কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য নেই।
অনুসন্ধানে ভারতীয় ডাকবিভাগের ওয়েবসাইটে অভিনেতা দেবের নামে কোনও স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি সেখানে পাওয়া যায়নি। তবে অভিনেতা দেবের পোস্টে থাকা ডাকটিকিটের ছবির সাথে ‘মাই স্ট্যাম্প’ (আমার ডাকটিকিট) নামে ভারতীয় ডাকবিভাগের এক স্কিমে প্রকাশিত ডাকটিকিট তথা 'ফেয়ারি কুইনের' সাথে মিল পাওয়া যায়।
ভারতীয় ডাকবিভাগের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ‘মাই স্ট্যাম্প’ হল ইন্ডিয়া পোস্টের পারসোনালাইজড (Personalised) ডাকটিকিটের ব্যবস্থা। নির্বাচিত স্মারক ডাকটিকিটের পাশে গ্রাহকের নিজের ছবি, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতীক, কিংবা শিল্পকর্ম, ঐতিহ্যবাহী ভবন, বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র, ঐতিহাসিক শহর, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য পশুপাখির ছোট ছবি (থাম্বনেইল) ছাপিয়ে এই ব্যক্তিগত ডাকটিকিটের সুবিধাটি পাওয়া যায়। দেখুন --
ডাকবিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, "একটি ‘মাই স্ট্যাম্প’ শিটে ১২টি ডাকটিকিট থাকে, যার প্রতিটির অভিহিত মূল্য ৫ টাকা এবং একটি শিটের দাম ৩০০ টাকা"।
এই বিষয়ে অনুসন্ধানে ২০১৭ সালে এবিষয়ে প্রকাশিত ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুর একটি প্রতিবেদনও একই তথ্য পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে সাংসদ-অভিনেতা দেবের পোস্ট করা ডাকটিকিটের ছবির অনুরূপ ট্রেনের ছবিসহ 'মাই স্ট্যাম্প' পরিষেবা ব্যবহার করে প্রকাশিত অন্য এক শিশুর ছবি ব্যবহার করে তৈরি ডাকটিকিট লক্ষ্য করা যায়। দেখুন--
প্রতিবেদনটিতে সেসময়ের তামিলনাডুর পশ্চিম সার্কেলের পোস্ট মাস্টার জেনারেল সারদা সম্পতের বক্তব্যের বরাতে উল্লেখ করে বলা হয়, ভারতীয় ডাকবিভাগের 'মাই স্ট্যাম্প' পরিষেবা ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে স্মারক ডাকটিকিট সবাই তৈরি করতে পারেন। তবে সম্পত আরও জানান, "ইন্ডিয়া পোস্ট (নিজে থেকে) যেসব স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে, তা শুধুমাত্র বিখ্যাত এবং প্রয়াত ব্যক্তিদের জন্যই এবং অনেক আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরেই এর অনুমোদন পাওয়া যায়।"
বিষয়টি অধিকতর নিশ্চিত হতে 'বুম লাইভ' ভারতীয় ডাকবিভাগের পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের যোগাযোগ ভবনের এক আধিকারিকের সাথে কথা বলেছে। বুমকে এই বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, "ভারতের কোনও জায়গায় কাউকে নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশিত হলে ... ডাকবিভাগের প্রতিটি সার্কেলকে তা সরকারিভাবে জানানো হয়। ইন্ডিয়া পোস্ট দেব অধিকারীর ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে বলে আমাদের কাছে এখন অবধি কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ (নিশ্চিত তথ্য) নেই।”
এছাড়াও তিনি ডাকবিভাগের 'পার্সোনালাইজড মাই স্ট্যাম্প' স্ক্রিমটি সম্পর্কে জানান, "ব্যক্তিগত উদ্যোগে 'মাই স্ট্যাম্প' বানানো হয়। পোস্ট অফিস কাউন্টারে সেই স্ট্যাম্প বিক্রি হয় না।"
অর্থাৎ ছবির স্মারক ডাকটিকিটটি ভারতীয় ডাকবিভাগ নিজেরা চালু করেনি।
সুতরাং, অভিনেতা ও সাংসদ দেবের নামে ভারতীয় ডাকবিভাগের স্মারক ডাকটিকিট চালু করার দাবিটি বিভ্রান্তিকর।




