ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। একইদিনে গণভোট আয়োজনের ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। জুলাই সনদের কিছু সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের ব্যাপারে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্যই মূলত এবারের গণভোট। এর আগেও বাংলাদেশে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের জনগণ জুলাই সনদে উপস্থিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলোর পক্ষে নাকি বিপক্ষে- সেটা জানার জন্যেই মূলত জাতীয় নির্বাচনের দিনেই একসাথে একইদিনে এবারের গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
গণভোট কী?
গণভোট হলো একটি সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়া। গণভোট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমত যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে ব্যালটে 'হ্যাঁ' এবং 'না' ভোটের ভিতরে যে কোনো একটিকে বাছাই করে নিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে মতামত দেন। মূলত কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন (Constitutional Amendment), বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত, বা সরকারের জনসমর্থন যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রতিফলিত হয়। কারণ, এখানে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে নয় বরং সরাসরি নিজেদের সিদ্ধান্ত জানায়। সুতরাং গণভোটে "হ্যাঁ" বিজয়ী হলে রাষ্ট্র চালানোর পদ্ধতিগত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
কেন এবারের গণভোট?
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। মূলত সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করেই গণভোটের ব্যাপারটি সামনে আসে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতে গণভোট আয়োজনের পক্ষে মতৈক্য হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়নের সুপারিশমালা হস্তান্তর করা হয়। জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রের সংস্কার ও চরিত্র বদলের জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের দীর্ঘদিনের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের মতামত জানাই এবারের গণভোটের মূল লক্ষ্য।
আসন্ন জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার সাথে সাথে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদও গঠন করা হবে। এই পরিষদ সংবিধান সংস্কারে 'গাঠনিক ক্ষমতা' প্রয়োগ করতে পারবে।
বাংলাদেশে এবার চতুর্থবারের মত গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের তৃতীয় গণভোটের আগে জাতীয় সংসদে গণভোট আইন পাশ করা হয়। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়, ‘যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনের ব্যবস্থা করে কোনো বিল সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে এতে রাষ্ট্রপতি সম্মতিদান করবেন না কি করবেন না, এই প্রশ্ন যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এই (গণভোট) আইন করা হলো।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট বাতিল করা হয়। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওই সংশোধনী বাতিলের মামলায় হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি গণভোটও পুনর্বহাল করে রায় দেয়। তাই, গণভোট আয়োজনে এখন কোনো বাধা নেই।
আগের গণভোটগুলোর বিষয়বস্তু কী ছিল?
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল প্রশাসনিক গণভোট এবং অন্যটি ছিলো সাংবিধানিক গণভোট।
- প্রথম গণভোট
বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের ফলাফলে দেখা যায়, মোট ভোট পড়ে প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছিল ৯৮.৯ শতাংশ এবং 'না' ভোট ছিল ১.১ শতাংশ।
- দ্বিতীয় গণভোট
১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতি আস্থা থাকলে 'হ্যাঁ' এবং আস্থা না থাকলে 'না' ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। এই গণভোটে ভোটার অংশগ্রহণের হার ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ। এর মধ্যে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছিল ৯৪.৫ শতাংশ এবং 'না' ভোট ছিল ৫.৫ শতাংশ।
- তৃতীয় গণভোট
বাংলাদেশের ইতিহাসের তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫.২ শতাংশ। ৮৪.৩৮ শতাংশ ভোটার 'হ্যাঁ' ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ১৫.৬২ শতাংশ ভোটার 'না' ভোট দেন।
- ২০২৬ এর গণভোট
সংবিধান সংস্কার বিষয়ক ৩০টি প্রশ্ন নিয়ে হবে এবারের গণভোট। এবারের গণভোটটি হবে মূলত সাংবিধানিক গণভোট। অর্থাৎ জুলাই সনদে অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও, গণভোট হবে কেবল সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব নিয়ে। এই ৩০ টি সংস্কার প্রস্তাবে জনগণের রায় জানা হবে গণভোটের মাধ্যমে।
এবারের গণভোট যে সব বিষয়ে
২০২৪ সালের ১৩ই নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছিলেন, চারটি বিষয়ের ওপর করা একটি প্রশ্নে 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দিতে হবে ভোটারদেরকে। গণভোটের ব্যালটে যে চারটি বিষয়বস্তুর উল্লেখ থাকবে সেগুলো ওই ভাষণে পড়ে শোনান তিনি। এবারের গণভোটের বিষয়গুলো হলো--
- নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
- সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
- সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
- জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোটে চারটি বিষয়ের উল্লেখ করে একটি প্রশ্ন করা হবে, "আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?"
অর্থাৎ, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। ভোটারদের এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যালট পেপারে 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দিয়ে নির্ধারিত বাক্সে প্রদান করতে হবে। গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে আগামী সংসদ নির্বাচনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে যদি ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার বিলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদকে দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে।
এছাড়াও, পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। যার মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ২৭০ দিনের মধ্যে যদি সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। ঐকমত্য কমিশন প্রণীত আদেশে গণভোট কীভাবে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন ও কার্যাবলি তুলে ধরা হয়েছে।
এবারের গণভোটে কী কী প্রস্তাব আছে?
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, তবে গণভোট প্রাধান্য পাচ্ছে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব। যদিও এই ৩০টি প্রস্তাবের বিস্তারিত উল্লেখ গণভোটের ব্যালটে থাকবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্নের একটি সেট থাকবে এবং এই সেটের পক্ষে বা বিপক্ষে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে হবে। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দফায় দফায় বৈঠকের পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও এর মধ্যে কোন কোনটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। শেষ পর্যন্ত নোট অব ডিসেন্ট সমাধানে ব্যর্থ হয়ে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গণভোটে হ্যাঁ জয় পেলে আগামী সংসদে যে রাজনৈতিক দলই নির্বাচিত হোক, এই ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। তবে, যদি না জয়যুক্ত হয় তাহলে জুলাই সনদই কার্যকর হবে না।
জুলাই সনদে বলা হয়েছে, সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে; তবে প্রস্তাবনাসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যথা ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যা অনুচ্ছেদ ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জারি করা ২০২৫ সনের ৬৭ নং অধ্যাদেশ মোতাবেক এবারের গণভোটের আলোচ্য বিষয়বস্তু হতে চলেছে নিম্নরূপ--
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।
- সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
- সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।
- বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
- যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
- সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।
- ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
- দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
- মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন: ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।
- দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
- রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষারও সাংবিধানিক স্বীকৃতি হবে।
গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট জিতলে কী ধরণের সংস্কার হবে?
গত বেশ কিছুদিন ধরে গণভোটের প্রচারণা শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই প্রচারণায় উঠে এসেছে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন দিক। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট যদি বিজয়ী হয়, নতুন সংসদকে সংসদ সদস্য হিসেবে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ১৮০ দিন পর্যন্ত গণপরিষদ হয়ে থাকতে হতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের সাথে অন্যান্য দলগুলোর সাথে নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। সংসদের মেয়াদ ৫ বছরই থাকবে, তবে একজন ব্যক্তি কোনোভাবেই যে মেয়াদেই হোক ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদ হবে দ্বিকক্ষ তথা উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষ বিশিষ্ট। সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরবে। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর পাওয়া আসনের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য নিয়ে। সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন। সংসদ সদস্যরা বাজেট ও আস্থা বিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে। তবে গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে জুলাই সনদে উপস্থিত যে সাংবিধানিক সংস্কারগুলো করা বাধ্যতামূলক হবে। সেগুলো হলো --
ভাষা, জাতি ও মৌলিক সংস্কার
- জুলাই সনদে বলা হয়েছে- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। তবে, দেশের অন্য সকল মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বাংলাদেশের নাগরিকরা এতদিন বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে বাংলাদেশি। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধুমাত্র বাংলার স্বীকৃতি রয়েছে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’।
- সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের আনা হবে। বর্তমানে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদ সদস্যদের থেকে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এছাড়াও, সংবিধানের প্রস্তাবনা- ৮,৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।
- এছাড়া সংবিধান বাতিলের ক্ষেত্রে বর্তমান সংবিধানে ৭ এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল যেটি জুলাই সনদে বিলুপ্ত করা হয়েছে।
- রাষ্ট্রের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি। তবে গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে – সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।
- বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদে সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদার বিষয়টি যুক্ত করা হবে।
- সংবিধানে বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। তবে জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে- নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি। অর্থাৎ, মৌলিক অধিকারের তালিকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের নিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী: নিয়োগ, ক্ষমতা, মৌলিক অধিকার, ভারসাম্য
- বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। জুলাই সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং সেখানে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হবে। জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।
- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে গোপন ব্যালটে এবং উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা, একাধিক পদে থাকার সুযোগ বাতিল এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।
- বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি।
- রাষ্ট্রপতি তার নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
- রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ দুই কক্ষের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।
সংসদ, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা
- বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধীদলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে।
- বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ এক কক্ষ বিশিষ্ট। জুলাই সনদে সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার পক্ষে বলা হয়েছে। উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে। নারীদের সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১০০ পর্যন্ত বৃদ্ধির ব্যাপারে বলা হয়েছে।
- এছাড়া সংসদ সদস্যদের দলীয় হুইপের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়। তবে, জুলাই সনদ অনুযায়ী বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে।
- সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাশ হলে একক কর্তৃত্ব হারাবে ইসি। তখন ইসির সাথে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে। স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় পরিমার্জন
- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় নয় বরং আপিল বিভাগ থেকে করা হবে। বিচারক নিয়োগে স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে। স্থায়ী এটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে। প্রতি বিভাগে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
- বর্তমান বিদ্যমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।
- ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুদকের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব রয়েছে। স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে।
- সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে, জুলাই সনদের এই অংশে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে।
- প্রধান বিচারপতির চাহিদার ভিত্তিতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। আগে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
- সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থা জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে। ন্যায়পাল, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন গঠনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা
- সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ মানুষ সমর্থন করছেন কি না, তা জানতে চাওয়া হবে গণভোটে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এই বাস্তবায়ন আদেশও গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা পাবে। এই আদেশের পটভূমিতে বলা আছে, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে, ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৮ আগস্ট বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। অর্থাৎ, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অভ্যুত্থানের সরকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে বর্তমান সরকার বৈধতা পাবে।
বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা হবে
- আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে অসদাচরণ বা অসমর্থ না হলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া যাবে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভাগীয় বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
- সাবেক বিচারপতিদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি হালনাগাদ করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় থাকবে। স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটালাইজ করা, আইনজীবীদের আচরণবিধি সংক্রান্ত বিষয় রাখা হয়েছে আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের জন্য। আদালত প্রাঙ্গলে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে।
অন্যান্য সংস্কার
- সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরের সংস্কারগুলো আইন, অধ্যাদেশ, বিধি এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে করা যাবে। এর মধ্যে বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন পুনর্গঠন এবং নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন করে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করার কথা বলা হয়েছে।
- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে। তথ্য অধিকার আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস আইনে সংশোধনী আনা হবে। জুলাই অভ্যুত্থানকালে গণহত্যা ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ আলাদা করা হবে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। উৎসবিহীন আয়কে বৈধতা দান বন্ধ করা হবে।
- সংসদীয় আসনের সীমানা প্রতি ১০ বছর পরপর নতুন করে ধার্য করা হতে পারে। জনপ্রতিনিধিদের সম্পত্তির বিবরণ নির্বাচন কমিশনে প্রতিবছর জমা দেওয়া এবং সেই তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার বিধান করা হতে পারে। তবে এসব বিস্তারিত সংস্কার বিষয় গণভোটের ব্যালটে উল্লেখ করা থাকবে না। মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করেই ভোটারদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে।
গণভোটে 'না' ভোট জিতলে কী হবে?
এমন নয় যে না ভোট জয়ী হওয়া মানেই সব সংস্কার বন্ধ হয়ে যাবে। মৌলিক সংস্কারই অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে। তবে, কিছু সংস্কার নির্বাহী আদেশেই বাস্তবায়িত হয়ে যাবে।
‘না’ ভোট জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জুলাই সনদ মেনে তাৎক্ষনিকভাবে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার উপরে নির্ভর করে সংবিধান সংস্কার করা হবে।
না ভোট জয়ী হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই নতুন সরকার গঠিত হবে। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তারা সঙ্গে সঙ্গে সরকার গঠন করবে। কোনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে না। তখন যে দল ক্ষমতায় আসবে, চাইলে তাদের মতো করে উচ্চকক্ষ গঠন করতেও না, নাও করতে পারে।
গণভোটে না জিতলে জুলাই সনদে আনতে চাওয়া যে যে বিষয়ে দলীয় নোট অব ডিসেন্ট ছিলো সেই বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বা সরকার গঠন করা দলের ইচ্ছার উপরে নির্ভর করে সংস্কার আসবে।
তবে বিরোধী দলগুলো সনদ মেনে সংস্কারের দাবি জানাতে পারে। সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দলীয়ভাবে সংসদ সদস্য পদলাভের অনুপাতে ভারসাম্যপূর্ণ থাকলে সংস্কারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
জুলাই সনদে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে যুক্ত করা হবে। সরকারি দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে এসব সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে। তবে, বিএনপির এতে ভিন্ন মতামত রয়েছে। বিএনপি আইনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পক্ষে। তবে, অন্যদলগুলো জুলাই সনদ অনুযায়ী চলতে চায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পূণর্বহাল করে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছে। আদালতের রায় মানার বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে জুলাই সনদ জনগণের রায় না পেলেও উচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়টি থাকবে। চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে যেটি কার্যকর করা হবে।
গণভোটে ভোট কীভাবে হবে?
সরকারি ওয়েবসাইট https://gonovote.gov.bd/voting-process-এ ভোটদানের প্রক্রিয়া জানানো হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারিকে গণভোট দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। এই ভোট দিতে হবে এই প্রক্রিয়ায়--
- ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলে ভোটারকে দুটি ব্যালট দেওয়া হবে। একটি সাদা অন্যটি গোলাপি।
- সাদা ব্যালট জাতীয় সংসদের সদস্য প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য, আর গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য।
- দুটি ব্যালটে আলাদাভাবে সিল দিয়ে একই বাক্সে রাখতে হবে।
- এমপি প্রার্থীদের ভোট দিতে হবে তার প্রতীক বা মার্কায় সিল দিয়ে। আর গণভোটের ব্যালটে সিল দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’র ওপর।
- অথবা ব্যালটের হ্যাঁ চিহ্নিত স্থানে ব্যালটে (√) অথবা না চিহ্নিত স্থানে (√) চিহ্ন দিতে হবে।
প্রবাসীদের ক্ষেত্রে Postal Vote BD অ্যাপটি মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে ভোটারের ঠিকানায় ডাকের মাধ্যমে ব্যালট ও ভোটপ্রদানের নির্দেশনা পৌছে দেয়া হবে। এভাবেই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হবে।
মোট কথা, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। “না” জয়ী হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে না। তবে, এমন নয় যে না জয়ী হওয়া মানে সংস্কারের পথ রুদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।




