মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বিভ্রান্তিকর তথ্য আছে: ডা. তারেক

কভিড আক্রান্তদের ওপর ইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগের গবেষণায় ভালো ফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে সংবাদ প্রতিবেদনে

১৬ মে দৈনিক কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যার শিরোনাম, "দেশে করোনা চিকিৎসায় বড় সাফল্য"।

আর্কাইভ লিংক: http://archive.is/DRmpz

একই খবর বাংলানিউজ প্রকাশ করেছে, "করোনা চিকিৎসায় বিস্ময়কর সাফল্য দেখছে বাংলাদেশি গবেষক দল"।

আর্কাইভ লিংক: http://archive.is/vXhb0

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে--

"দেশের প্রথম বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তারেক আলম তাঁর একজন সহযোগী চিকিৎসককে নিয়ে প্রায় দেড় মাসের গবেষণায় করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় পেয়েছেন নতুন আশার আলো।

ডা. আলম কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল মেডিসিন ইভারমেকটিনের সিঙ্গল ডোজের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মাত্র তিন দিনে ৫০ শতাংশ লক্ষণ কমে যাওয়া আর চার দিনে করোনাভাইরাস টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসার বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছেন।"

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে--

"আমরা বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬০ জন রোগীর ওপর গবেষণা করেছি। তাতে আমরা এই সাফল্য পেয়েছি। আমাদের গবেষণার আওতায় ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ওষুধ দুটির সফল স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে।'

সম্মান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই গবেষণায় অধ্যাপক ডা. তারেক আলমের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক ডা. রুবাইয়ুল মোরশেদসহ অন্যরা সহযোগিতা করেন।"


ডা. তারেক আলম Boom Bangladesh-কে যা বললেন:

উপরের সংবাদটির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তারেক আলমের সাথে যোগাযোগ করে Boom Bangladesh.

তিনি জানান, তারা কোনো গবেষণা করেননি। কভিড-১৯ পজিটিভ হওয়া ৬০ জন রোগীকে গত কয়েক সপ্তাহে চিকিৎসা দিয়েছেন। যেহেতু কভিডের চিকিৎসায় কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, ফলে তারা বিদেশি একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলকে আমলে নিয়ে অন্য রোগের জন্য তৈরি দুটি ওষুধের মিশ্রণ রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে ভালো ফলাফল পেয়েছেন।

ডা. তারেকের ভাষায়, "প্রথমত, আমাদের হাসপাতাল কভিড ডেজিগনেটেড হাসপাতাল নয়। ফলে এখানে করোনার রোগীরা সাধারণত আসছেন না। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের এখানে আসার সুযোগ নেই। কারণ তাদের চিকিৎসা দেয়ার মতো সুযোগ সুবিধা এখানে থাকার কথা নয়। তবে এরপরেও কিছু রোগী উপসর্গ নিয়ে আসায় আমরা তাদের টেস্ট করে কভিড পজিটিভ পাওয়ায় চিকিৎসা দিয়েছি।"

এরকম ৬০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার সময় দুটি ওষুধের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান ডা. তারেক জানান। রোগীদের মধ্যে ৬/৭ জনের অবস্থা কিছুটা গুরুতর ছিলো, বাকিরা ছিলেন একদম প্রাথমিক পর্যায়ের আক্রান্ত।

ডা. তারেক আরও বলেন, "এসব রোগীদের ওপর আমরা অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল মেডিসিন ইভারমেকটিনের সিঙ্গল ডোজ এর সাথে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন মিশিয়ে প্রয়োগ করেছি। মূলত অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনির্ভাসিটির একটি গবেষণায় ল্যাব টেস্টে (সেল কালচারে, প্রাণি বা মানুষের শরীরে নয়) এমন ওষুধ প্রয়োগে ভালো ফলাফল আসা এবং পেরু, ইরাকসহ কয়েকটি দেশে একই পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা চলার প্রেক্ষিতে আমরাও পরীক্ষামূলকভাবে এটি প্রয়োগ করেছি। এবং বেশ ভালো ফল পেয়েছি।"

কেমন ভালো ফলাফল পেয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে কভিড পজিটিভ নিয়ে আসা ৬০ জন কয়েক দিনের মধ্যে নেগেটিভ হয়েছেন। অর্থাৎ, শতভাগই সেরে উঠেছেন।

আপনাদের এই কাজকে 'গবেষণা' বলার সুযোগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তর ডাক্তার তারেক বলেন, "প্রশ্নই আসে না। আমরা তো গবেষণা করেছি এটা বলিনি, শুধু এখানে আসা রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছি। যেহেতু কভিড ডেজিগনেটেড হাসপাতালই নয়, ফলে আমাদের এখানে গবেষণা করার সুযোগও নেই। এবং গবেষণার জন্য যেসব শর্ত মেনে চলতে হয় সেগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা এসব কিছু করিনি। এটা নিয়ে মিডিয়ার রিপোর্ট আমি পড়েছি। সেখানে অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়া হয়েছে যা থেকে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।"

তিনি জানান, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আইসিডিডিআর,বি এই ওষুধের প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা শুরু করবে, যেমনটি দেশের বাইরেও একাধিক প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে।

ডাক্তার তারেকের মতে, এই ওষুধ যে কেউ ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। শুধু চিকিৎসা প্রদানকারী ডাক্তাররা যদি মনে করেন কারো ওপর এটা প্রয়োগ করা যেতে পারে তাহলে তারাই শুধু করতে পারবেন।

কালের কণ্ঠ এবং বাংলানিউজের প্রতিবেদনে "সম্মান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই গবেষণা" হয় বলে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক আলম বলেন, গবেষণাই যেহেতু হয়নি ফলে কারো উদ্যোগে হওয়ারও সুযোগ নেই। তবে আমাদের চিকিৎসা কার্যক্রমে অন্য একজন চিকিৎসক সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন যিনি সম্মান ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।"

আমাদের সিদ্ধান্ত:

কয়েকজন রোগীর চিকিৎসার ফলাফলকে 'গবেষণা' হিসেব তুলে ধরে খবর পরিবেশন করা বিভ্রান্তিকর। একইসাথে যে গবেষণার উদ্যোগই নেয়া হয়নি সেটির 'উদ্যোক্তা' হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করার বিষয়টি তথ্য হিসেবে অসত্য।

Updated On: 2020-05-16T17:49:22+05:30
Show Full Article
Next Story
Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors.
Please consider supporting us by disabling your ad blocker. Please reload after ad blocker is disabled.