বানোয়াট ভিডিও দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামে ভিত্তিহীন বক্তব্য প্রচার

বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের দুটি ভিডিও'র অংশ বারবার যুক্ত করে মনগড়া আবহ কণ্ঠ দিয়ে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ''ওসি প্রদীপের ফাঁসি দেওয়া উচিত''। দেখুন এমন দুটি পোস্ট এখানে এবং এখানে

গত ১২ সেপ্টেম্বর 'রেডিও বার্তা' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় যার ক্যাপশন ছিল, 'ওসি প্রদীপের ফাঁসি দেওয়া উচিত বললেন প্রধানমন্ত্রী, ওসি প্রদীপ নিয়ে যা বললো প্রধানমন্ত্রী'। ভিডিওটিতে এক ব্যক্তিকে দীর্ঘ এক প্রশ্ন করতে দেখা যায়, যেখানে প্রশ্নকর্তার চেহারা এক ব্যক্তির স্থির ছবি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে এবং জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায়। ক্যাপশনে দাবি করা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। উল্লেখ্য, আজ ২২ সেপ্টেম্বর সিনহা হত্যা মামলার তৃতীয় দিনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে অর্থাৎ মামলাটি এখনো বিচারাধীন। ১৬ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি এখন পর্যন্ত ১৪ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে। দেখুন স্ক্রিনশট--


এছাড়া একই শিরোনামে ভিডিওটি গত ২৭ আগস্ট ইউটিউবেও আপলোড করা হয়েছে। ইউটিউবের ভিডিওটি দেখুন--


ফ্যাক্ট চেক:

বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ক্যাপশনসহ ভাইরাল এই ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর।

প্রথমত, ভিডিওটির ক্যাপশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য হিসেবে যে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা ১৬ মিনিটের এই ভিডিওটির ভেতরে কোথাও নেই। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের যে অংশটুকু ভিডিওতে যুক্ত করা হয়েছে তাতে তাঁর এমন কোনো বক্তব্য নেই। ভিডিওটির ১৪ মিনিট থেকে প্রধানমন্ত্রীকে কথা বলতে দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত ওসি প্রদীপ সংক্রান্ত কোনো কথা তিনি বলেননি।

দ্বিতীয়ত, ভিডিওটির ১৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, "কোনো অন্যায় হলে তার ব্যবস্থা আমি নিব, আমরাই নিব সেটা। সেটা যেই হোক। সে আমার দলের লোক হোক। আর যদি আমি কোনো বিচার করতে চাই, তাহলে তো ঘরের থেকেই শুরু করতে হবে…"। এছাড়া ভিডিওটিতে শেখ হাসিনার একপাশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন ও অন্যপাশে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত কিওয়ার্ড সার্চ করে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিওটির এই অংশটি মূলত ২০১৯ সালে জাতিসংঘের ৭৪ তম অধিবেশন পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে নেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলা সংবাদমাধ্যম TBN24 এর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওটির ১৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ড থেকে এই বক্তব্য পাওয়া গেছে। মূলত ভিডিওটির সেই অংশ থেকে পরবর্তী কিছু অংশ কেটে আলোচ্য ভিডিওটিতে যুক্ত করা হয়েছে। এই ভিডিওটিতেও ওসি প্রদীপ সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দেখুন TBN24 এ আপলোড করা ভিডিওটি এখানে--

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে এক তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। পরে এই হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ গ্রেফতার হন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দেখুন এখানে। সুতরাং এই ঘটনার আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোন সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য দেয়ার দাবি একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।

তাছাড়া ভিডিওটির শুরু থেকে একজন প্রশ্নকর্তাকে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, যার চেহারা এক ব্যক্তির স্থিরচিত্র দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। প্রশ্নকর্তার গলায় নীল একটি আইডি কার্ডের ফিতা ঝুলানো আছে। বিস্তারিত সার্চ করে এই ভিডিওটিও বের করতে সক্ষম হয় বুম বাংলাদেশ। মূলত 'সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন' আয়োজিত 'লেটস টক উইথ সজীব ওয়াজেদ' নামের একটি অনুষ্ঠানের একজন প্রশ্নকর্তার ফুটেজকে আলোচ্য ভিডিওতে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট আপলোড করা ভিডিওটির খণ্ডাংশ ও ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের কিয়দংশ বারবার যুক্ত করে, আবহে নতুন কণ্ঠ দিয়ে ভাইরাল ভিডিওটির প্রশ্নকর্তার অংশটি তৈরি করা হয়েছে। দেখুন ভাইরাল ভিডিও ও আসল ভিডিওটির সেই অংশের স্ক্রিনশটের পাশাপাশি কোলাজ--

ভাইরাল ভিডিওটি (বামে) আসল ভিডিওটি (ডানে)
ভাইরাল ভিডিওটি (বামে) আসল ভিডিওটি (ডানে)

সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখুন এখানে--

অর্থাৎ একাধিক পুরোনো ভিডিওকে এডিট করে একটি বিচারাধীন মামলায় ওসি প্রদীপকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাতে বানোয়াট ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি প্রচার করা হচ্ছে; যা বিভ্রান্তিকর।

Claim :   ওসি প্রদীপের ফাঁসি চাই প্রধানমন্ত্রী, ওসি প্রদীপকে নিয়ে একি বললেন প্রধানমন্ত্রী
Claimed By :  Facebook Posts
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story
Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors.
Please consider supporting us by disabling your ad blocker. Please reload after ad blocker is disabled.