জুস পান করা অবস্থায় ইরানি সৈন্যের মিসাইল ছোড়ার ভিডিওটি এআই তৈরি
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, জুস পান করতে করতে ইরানি সৈন্যের মিসাইল ছোড়ার ভিডিওটি বাস্তব নয় বরং এটি গুগলের এআই ভিডিও জেনারেশন টুল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্ম পরিহিত একজন ইরানি সৈন্য সেলফি স্টিকে ভিডিও ধারণ করার পাশাপাশি বাম হাতে জুস পান করছেন এবং তার ঠিক পেছনেই একটি সামরিক যান থেকে মিসাইল উৎক্ষেপণ হতে দেখা যাচ্ছে। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, 'জুস পান করতে করতে ছুঁড়ছে মি'সা'ই'ল, ইরানের ভিডিও ভাইরাল!'। এ ধরনের পোস্ট দেখুন কালবেলা, যুগান্তর, বিডিনিউজ২৪, বাংলানিউজ২৪। ভিডিওটির উপর নির্ভর করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক এবং ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে যমুনা টেলিভিশন ও বার্তা বাজার।
গত ২৮ মার্চ 'Kalbela World' পেজ থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, 'জুস পান করতে করতে ছুঁড়ছে মি'সা'ই'ল, ইরানের ভিডিও ভাইরাল! পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
যুগান্তর, বিডিনিউজ২৪, বাংলানিউজ২৪ এর পোস্টগুলোর স্ক্রিনশটের কোলাজ দেখুন --
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, দাবিটি সঠিক নয়। ভিডিওটি বাস্তব কোনো ঘটনার দৃশ্য নয় বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID শনাক্তকরণ টুলে ভিডিওটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং এতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একইসাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত ভিডিওটিকে এম্বেড করে দেওয়া হয় প্রতিবেদনে। এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত ভিডিওটির স্ক্রিনশট দেখুন --
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত পোস্টে ভিডিওটি বাস্তব কিনা তা উল্লেখ না করা হলেও এটিকে 'ফান পোস্ট' উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবেদনের পোস্টের ক্যাপশনে যমুনা টেলিভিশন ব্যতীত অন্য কেউ এই বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়নি। আর ভিডিওটি যে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি সেই বিষয়টি ক্যাপশনে কোনো গণমাধ্যমই উল্লেখ করেনি। ফলে পাঠক যারা শুধুমাত্র ক্যাপশন পড়ে কিংবা পূর্ণ প্রতিবেদন না দেখে তাদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়
অনুসন্ধানে আলোচ্য ভিডিওটি থেকে কী-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স সার্চ করে গ্রহণযোগ্য কোনো মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে কয়েকটি অসঙ্গতি পাওয়া যায়। ব্যক্তিটি স্কেটবোর্ড নিয়ে চলন্ত অবস্থায় থাকলেও তার শরীরের ভারসাম্য এবং স্কেটবোর্ডের মুভমেন্ট বাস্তবের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। ব্যক্তির হাতে থাকা বোতল এবং তার আঙুলগুলো মাঝেমধ্যে একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে (Blending), যা এআই ভিডিওর একটি সাধারণ ত্রুটি।
বাস্তব সম্মত ভিডিও ও নেটিভ অডিও তৈরিতে গুগলের ভিডিও জেনারেশন টুল 'Veo'-এর ব্যবহার সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 'Veo' হলো গুগলের একটি প্রায় বাস্তবসম্মত ভিডিও জেনারেশন টুল যা গুগল ডিপমাইন্ড দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। এটি টেক্সট-টু-ভিডিও জেনারেশন, ইমেজ-টু-ভিডিও তৈরি করার টুল এবং সর্বশেষ সংস্করণ, Veo 3.1 ভিডিওর পাশাপাশি নেটিভ অডিও তৈরি করতে পারে।
এছাড়াও গুগলের জেনারেটিভ টুল তাদের কন্টেন্টে 'SynthID' নামক এক ধরণের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা শোনা যায় না বা খালি চোখে শনাক্ত করা যায়না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় যাচাই করলে টুলটি আলোচ্য ভিডিওটিকে 'গুগলের এআই টুল দিয়ে তৈরি' বলে ফলাফল দিয়েছে। দেখুন --
ভিডিওতে 'SynthID' শনাক্ত করলেও টুলটি অডিওতে 'SynthID' শনাক্ত করতে পারেনি। সাধারণত একটি ভিও-জেনারেটেড ভিডিওর কোয়ালিটি বিভিন্ন কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়ে গেলে কিংবা সম্পাদনার কারণে কম্প্রেস হলে 'SynthID' ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে কিংবা শনাক্ত হয়না। অথবা ভিডিওর অডিও পরিবর্তন করে ভিন্ন কোনো অডিও বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যুক্ত করলেও অডিওতে 'SynthID' শনাক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
পরবর্তীতে আরেক জেনারেটিভ কন্টেন্ট শনাক্তকরণ টুল 'Hive'-এর মাধ্যমে যাচাই করলেও টুলটি কনটেন্টটিকে ৯৭.৮% সম্ভাব্য এআই দ্বারা তৈরি বলে ফলাফল দিয়েছে। টুলটি এমনকি ভিডিওটিকে সম্ভাব্য ভিও টুলের (গুগলের ভিডিও জেনারেটিভ মডেল) মাধ্যমে তৈরি বলেই ফলাফল দিয়েছে। দেখুন --
অর্থাৎ ভিডিওটি এআই দ্বারা তৈরি।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কোনো বাস্তব দৃশ্যেকে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন সংস্করণের হুবহু একই ছবি তৈরি করলেও এই ধরণের কনটেন্টকে এআই তৈরি কনটেন্ট এবং এই ধরণের কোনো কনটেন্টে কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত) বা ব্যক্তির উপস্থিতি সহ কোনো কাজকে নকল করার চেষ্টা করা হলে তা ডিপফেক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য হয়।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে জুস পান করতে করতে ইরানি সৈন্যের মিসাইল ছোড়ার দৃশ্যটি বাস্তব মর্মে যে তথ্য প্রচার করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর।




