মদ সহ বিএনপির সংসদ সদস্যের বলে প্রচারিত ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয়। এটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদিত একটি কৃত্রিম ছবি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি প্রচার করে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম মদ্যপান করছেন তার পাশে মদের বোতল রয়েছে। এরকম দুইটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
গত ৭ জুলাই ‘Journalist Elias Hossain Fans’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে। পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরো এক বোতল মদ একাই গিলে ফেলে দেশকে মাদকমুক্ত করছেন লক্ষীপুর-১ আসন (রামগঞ্জ) বিএনপির এমপি সাহাদাত হোসেন সেলিম। স্ক্রিনশট দেখুন --
ফ্যাক্ট-চেক
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয় মূলত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবিটি সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে লক্ষ্মীপুর টিভি নামের একটি সাইটে গত ৫ জুলাই "এআই দিয়ে এমপি সেলিমের ছবি বিকৃত করে প্রচারের অভিযোগে প্রতিবাদ" শিরোনামে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, "অভিযোগকারীদের দাবি, ছবিটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে।"
নিখুঁত ফলাফল, তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্যতা ও বিনামূল্যের হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই দিয়ে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে মদের বোতল ও চানাচুরের জায়গাটিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন--
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামাজিক মাধ্যমে মদের বোতল ও চানাচুর ব্যতীত আলোচ্য ছবিটিও পাওয়া গেছে। এসব পোস্টে (১, ২, ৩) ছবিটিকে মূল ছবি হিসেবে দাবি করে বলা হয়েছে ছবিতে মদের বোতল ও চানাচুর যুক্ত করা হয়েছে। তবে যাচাইয়ে আলোচ্য ছবিটিতেও SynthID শনাক্ত হয়েছে। দেখুন--
যেহেতু উভয় ছবিতেই পুরোপুরিভাবে সবজায়গায় সিন্থআইডি পাওয়া যায়নি তাই বলা যায় উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী কোনো ছবিতে এআই দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে। সম্পাদনার মাধ্যমে মদের বোতল ও চানাচুর যুক্ত করা হয়েছে। মূল ছবি দাবিকৃত ছবিটির ক্ষেত্রে যেখানে সিন্থআইডি পাওয়া গেছে সেখানে মদের বোতল ও চানাচুরের ছবি এই দিয়ে সম্পাদনার মাধ্যমে মুছে ফেলা কিংবা অন্য কোনো সম্পাদনা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
অর্থাৎ, মদের বোতল সহ ছবিটি বাস্তব নয়।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কোনো বাস্তব দৃশ্যকে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন সংস্করণের হুবহু একই ছবি তৈরি করলেও এই ধরণের কনটেন্টকে এআই তৈরি কনটেন্ট এবং এই ধরণের কোনো কনটেন্টে কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত) বা ব্যক্তির উপস্থিতি সহ কোনো কাজকে নকল করার চেষ্টা করা হলে তা ডিপফেক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য হয়।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে এআই দ্বারা তৈরি ছবি বাস্তব মসজিদের ছবি বলে প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




