এআই ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে প্রচার
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, এআই ছবি যুক্ত করে যমুনা টেলিভিশনের ফটোকার্ড ফরম্যাট সম্পাদনা করে প্রচার করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমে সাক্ষাতের কথিত একটি ছবিযুক্ত ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। ফটোকার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে বসবে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরও ৩টি ইসলামপন্থি দলের শীর্ষ নেতারা। এ ধরনের দুটি পোস্ট দেখুন এখানে ও এখানে।
গত ১৫ জানুয়ারি ‘Md Kamal Hossain’ নামক প্রোফাইল থেকে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ। ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে দেশ। দেশনায়ক তারেক রহমান এবং শায়খে চরমোনাই হুজুর মুফতি ফয়জুল করিমের নেতৃত্বে সম্ভবত রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আসছে।......” (বানান অপরিবর্তিত)। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয় এবং ফটোকার্ডটিও ভুয়া। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের সাক্ষাতের ছবিটি এআই প্রযুক্তিতে তৈরি। এছাড়াও ফটোকার্ডটিও যমুনা টেলিভিশনের ফটোকার্ড ফরম্যাট সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে।
সার্চ করে ফটোকার্ডটিতে উল্লিখিত গত ১৪ জানুয়ারি আলোচ্য শিরোনামের কোনো ফটোকার্ড যমুনা টেলিভিশনের ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়নি। সরাসরি সার্চ করেও যমুনা টেলিভিশনের অনলাইনসহ কোনো গণমাধ্যমেই এই সংক্রান্ত কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ফটোকার্ডটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত অন্যান্য ফটোকার্ডের সাথে কয়েকটি অসঙ্গতি পাওয়া যায়। আলোচ্য প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে লেখার ফন্টের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আলোচ্য ফটোকার্ড (বামে) ও গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ফটোকার্ডের (ডানে) পাশাপাশি তুলনা দেখুন--
ফটোকার্ডের ছবিটির ক্ষেত্রে শুরুতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে গ্রহণযোগ্য কোনো মাধ্যমে ছবিটির বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পর্যবেক্ষণে ছবিটিতে তাদের দুজনেরই চেহারায় বাস্তবের সাথে কিছুটা অমিল পরিলক্ষিত হয়। ফলে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি কিনা সে বিষয়ে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। কারণ কিছুক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে এ ধরণের অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একের অধিক আলাদা আসল ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে একই দৃশ্যে তাদের জুড়ে দেওয়ার উদাহরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিখুঁত এবং সহজলভ্য হওয়ায় এই ধরণের সরাসরি বা ছবি থেকে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরণের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে।
জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটিকে যাচাই করা হয়েছে। কেননা গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কন্টেন্টে সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরণের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন--
অর্থাৎ ছবিটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি করে পরবর্তীতে যমুনা টেলিভিশনের একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে তার সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সার্চ করে গত ১৪ জানুয়ারি তারেক রহমান ও মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের সাক্ষাতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়না। অর্থাৎ ঐ দিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে সাক্ষাতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী ঐক্যজোট সহ ১২–দলীয় জোটের সাথে ১৪ জানুয়ারি তারেক রহমানের সাক্ষাৎ হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ পাওয়া যায়।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার দৃশ্যের বলে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ছবি যুক্ত করে ভুয়া তথ্যসম্বলিত সম্পাদিত ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




