চলমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে পুরোনো ছবিকে ভুয়া দাবিতে প্রচার

বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ছবিটি ২০১৬ একটি ঘটনার যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো জড়িত থাকার প্রমাণ নেই বরং অভিযুক্ত একজন মুসলিম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একাধিক আইডি ও পেজ থেকে একটি ছবি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, কুমিল্লায় এক মসজিদে হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ ঢুকে কুরআন শরীফ ছিড়ে ফেলেছে। ছবিটিতে মসজিদের ভেতরে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কিছু বইয়ের পাতা (কোরআনের ছেঁড়া পৃষ্ঠা বলে দাবি) ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

১৪ অক্টোবর 'মুহাম্মদ কিবরিয়া শাহপুরী' নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ছবিটি পোস্ট করে বর্ণনায় যা লেখা হয়েছে তা হুবহু তুলে ধরা হলো--

"কুমিল্লায় এক মসজিদে ঢুকে হিন্দুরা কুরআন শরীফ ছিড়ে মলমূত্র ত্যাগ করে আসলো কাদের ছায়াতলে? মসজিদে ঢুকে কুরআন শরীফ ছিড়ে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে যায় এর চাইতে বড় অবমাননা আর কি আছে?

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের একটি জামে মসজিদে মল-মূত্র ত্যাগ, ২৫/৩০ টি কোরআন শরীফ ছিড়ে ফেলা, কোরআন রাখার রেল ও মসজিদের ৪ টি জানালার গ্লাস ভাংচুর করার খবর পাওয়া গেছে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের ধান্যদৌল গ্রামের বাজারের জামে মসজিদে মঙ্গলবার গভীর রাতে হিন্দুরা মূল দরজার তালা খুলে প্রবেশ করে। পরে মসজিদের ৪টি জানালার গ্লাস, কোরআন শরীফ রাখার বেশ কিছু রেল ভাংচুর, ২৫/৩০টি পবিত্র কোরআন শরীফ ছিড়ে ফেলে এবং মসজিদের মেহরাব সংলগ্নস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করে পূণরায় দরজায় তালা আটকিয়ে পালিয়ে যায়। (http://bit.ly/2e8fCTd, http://bit.ly/2enFIxC)

আল্লাহ পাকের ঘর মসজিদে ঢুকে যখন হিন্দুরা কুরআন শরীফ ছিড়ার সাহস দেখাচ্ছে, সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করার সাহস দেখাচ্ছে প্রশ্ন হচ্ছে কাদের ছায়াতলে থেকে এই সাহস পাচ্ছে?

একের পর এক ইসলাম অবমাননা হচ্ছে সরকার নিরব কেন?"

পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--

পোস্টটি দেখুন এখানে

অর্থাৎ পোস্টটিতে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ না দিয়েই দাবি করা হচ্ছে, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল মসজিদের ঘটনার সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি বিশেষ জড়িত। পাশাপাশি পোস্টটিতে ঘটনাটি কবে সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।

ফ্যাক্ট চেক:

বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ঘটনাটি ২০১৬ সালের। তৎকালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় একটি মসজিদে পবিত্র কুরআন বিনষ্টকরণের ঘটনাটি সত্য হলেও, উক্ত ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। বরং ওই ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার অভিযুক্ত ব্যক্তি মুসলিম ধর্মাবলম্বী। পাশাপাশি ছবিগুলোও উক্ত ঘটনার বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অর্থাৎ ঘটনাটি সত্য কিন্তু উক্ত ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জড়িত থাকার দাবিটি সঠিক নয়।

রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা যায়, বিগত বছরেও বিভ্রান্তিকর দাবিতে ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এমন একটি পোস্টের স্ক্রিনশট দেখুন-

পোস্টটি দেখুন এখানে

সার্চ করার পর সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়ানো এই ছবিটি ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর অনলাইন ভিত্তিক গণমাধ্যম জাগোনিউজ২৪ ডটকম-এ " কুমিল্লায় মসজিদে কোরআন বিনষ্টকরণের ঘটনা ২০১৬ সালের : পুলিশ" শিরোনামে খবরে খুঁজে পাওয়া যায়। মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনলাইন নিউজ পোর্টাল ডিএমপি নিউজের বরাত দিয়ে জাগোনিউজ২৪ ডটকম-এর খবরে বলা হয়-

"সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মসজিদে পবিত্র কোরআন বিনষ্টকরণের ঘটনা সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, ঘটনাটি ২০১৬ সালের। তাই গুজবে কান না দিতে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।"

অর্থাৎ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মসজিদে পবিত্র কোরআন বিনষ্টকরণের ঘটনাটি ২০১৬ সালের বা ৫ বছর আগের।

পাশাপাশি খবরটিতে উক্ত ঘটনা অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে,

"পুলিশ সদর দফতরের বরাত দিয়ে ডিএমপি নিউজ জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া উল্লেখিত শিরোনামের ঘটনাটি ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখের। ওই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছিল, যার নম্বর-১১/২১৬, তারিখ-১৯/১০/২০১৬। মামলার সংশ্লিষ্ট আসামি মো. জাহাঙ্গীর আলমকে (৩৮) পুলিশ দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তকে আসামি করে পুলিশ এই মামলায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে, যার নম্বর-২১২, তারিখ-৩০/১১/২০১৬। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন।" খবরটির স্ক্রিনশট দেখুন-

খবরটির আর্কাইভ লিংক দেখুন এখানে

অর্থাৎ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মসজিদের উক্ত ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বরং পুলিশ তৎকালে সেই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। খবরে উক্ত ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিবরণও উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও বিস্তারিত সার্চ করার পর দেখা যায়, ২০১৯ সালে ঘটনাটি ফেসবুকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভাইরাল হলে বাংলাদেশ পুলিশের অফিশিয়াল ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদরদপ্তর থেকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে প্রেস নোট জারি করা হয়। দেখুন--

অর্থাৎ ৫ বছর আগের একটি ভিন্ন ঘটনার ছবিকে কুমিল্লায় চলমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভুয়া দাবিতে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তিকর।

Updated On: 2021-10-14T20:10:03+05:30
Claim Review :   কুমিল্লায় এক মসজিদে ঢুকে হিন্দুরা কুরআন শরীফ ছিড়ে
Claimed By :  Facebook Posts
Fact Check :  Misleading
Show Full Article
Next Story