মুশফিকুর নয়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে চট্টগ্রামের জিওসি ছিলেন মাইনুর
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ছিলেন ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে একটি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ছিলেন মীর মুশফিকুর রহমান। এরকম কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
গত ২৭ জুলাই ‘Towhidul Islam Riaz’ নামক একটি আইডি থেকে একটি ছবি পোস্ট করে উল্লেখ করা হয়, “পরবর্তী সেনাপ্রধানের হিসেবে যার নামটা বেশি উচ্চারিত হয় তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান স্যার! জুলাইয়ে যখন ছাত্র জনতাকে,, কঠোরভাবে দমনে তৎকালীন সরকার সামরিক বাহিনীকেও,,, সর্বোচ্চ ব্যাবহারের চেষ্টা করেছিল! তখন স্রোতের বিপরীতে হাটেন এই মুশফিক স্যার! তখন তার অধীনস্থ কমান্ডকে মানুষের উপর চড়াও না হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি!! ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে,, ওই অঞ্চলের সাধারণ শিক্ষার্থী আর জনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন! বর্তমানে তিনি এই তিন তারকা বিশিষ্ট জেনারেল সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (পিএসও) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন! লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান স্যারের জন্য শুভকামনা।” নিচে পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, আলোচ্য দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান; মীর মুশফিকুর রহমান নয়।
আলোচ্য দাবির প্রেক্ষিতে কি ওয়ার্ড সার্চ করে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ এর ‘সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ’ এর ওয়েবসাইটে “Lieutenant General Mir Mushfiqur Rahman, BSP, SUP, ndc, psc” শীর্ষক তথ্য পাওয়া যায়। যেখানে মীর মুশফিকুর রহমান সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ২৪ সালের সে সময়ে আর্মি হেডকোয়ার্টারের সামরিক সচিব ছিলেন এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সে বছরের ২৪ অক্টোবর তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে যোগদান করেন এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পদোন্নতি পেয়ে হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। স্ক্রিনশট দেখুন--
পাশাপাশি, কি ওয়ার্ড সার্চ করে “সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল, ডিজিএফআইয়ের নতুন ডিজি জাহাঙ্গীর আলম” শিরোনামে দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’র ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। ১৪ অক্টোবর, ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বদলি হওয়া অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে সেনাসদরের সামরিক সচিব মীর মুশফিকুর রহমানকে চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়েছে।” অর্থাৎ তিনি গণঅভ্যুত্থান নয়, গণঅভ্যুত্থানের পরে চট্টগ্রামে জিওসি হিসেবে যোগদান করেন। স্ক্রিনশট দেখুন--
এছাড়া, কি ওয়ার্ড সার্চ করে “Bangladesh Army undergoes major reshuffle” শিরোনামে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার ইংরেজি ভার্সনের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। ১৫ অক্টোবর ২০২৪ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মো. মাইনুর রহমানকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের (আর্টডক) জিওসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে।” স্ক্রিনশট দেখুন--
প্রসঙ্গত, বর্তমানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানকে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আল জাজিরার সাংবাদিক ‘জুলকারনাইন সায়ের’র একটি ফেসবুক পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট করা পোস্টে বলা হয়, “২০২৪-এর জুলাইয়েও চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক শক্তিশালী কেন্দ্র। ৩ আগস্ট নিউ মার্কেট এলাকার ছাত্র-জনতার সভার পর, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মো. মাইনুর রহমান আন্দোলনের সঙ্গে কার্যত একাত্মতা ঘোষণা করেন। ৪ আগস্ট পতিত সরকারের মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলে, এরিয়া কমান্ডার হিসেবে তাঁর দৃঢ় পদক্ষেপে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তখনো হাসিনা সরকারের পতন হবে কি না, তা একেবারেই নিশ্চিত নয়; সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেও জনাব মাইনুর রহমান যে বীরোচিত অবস্থান নিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”
একইভাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে নিয়ে সায়ের লেখেন, “আগস্ট ২০২৪, হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরই সেনাবাহিনীর ‘ব্ল্যাকশিপ’ খ্যাত দুই কর্মকর্তা— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পলাতক) মুজিবুর রহমান এবং মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান, সেনাসদরে অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সেনাপ্রধানকে ধরাশায়ী করে সেনাবাহিনীর কমান্ড হস্তগত করা। ঠিক সেই মুহূর্তে সেনাসদরে এমএস (মিলিটারি সেক্রেটারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মেজর জেনারেল (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মীর মুশফিকুর রহমান। তাঁর তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, ঠাণ্ডা মাথার নেতৃত্ব এবং কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নিঃস্বার্থ সহায়তায় ওই সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনী রক্ষা পায় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে, আর গণঅভ্যুত্থানের সদ্য–অর্জিত বিজয় সমুন্নত থাকে।” পোস্টটি দেখুন--
অর্থাৎ, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে মীর মুশফিকুর রহমান নয়; বরং লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান তৎকালীন দায়িত্বে ছিলেন এবং মাইনুর রহমানও ছাত্র-জনতার বিপক্ষে ভূমিকা পালন করেননি।
সুতরাং, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে মীর মুশফিকুর রহমান বলে প্রচার করা হচ্ছে ফেসবুকে, যা বিভ্রান্তিকর।




