ইরানের আঁকা যুদ্ধ বিমানের ছবিতে ইসরায়েলের হামলার বলে এআই ছবি প্রচার
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয়। অর্থাৎ ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, 'উপরের দিক থেকে তোলা একটি ছবিত একটি বিমানঘাঁটিতে তিনটি যুদ্ধবিমান দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে বাম ও ডান পাশের বিমান দুটি অক্ষত অবস্থায় রানওয়েতে স্থির আছে। ছবির ঠিক মাঝখানে থাকা তৃতীয় বিমানটি একটি বড় গর্ত বা বিস্ফোরণের কেন্দ্রে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। গর্তটি বেশ গভীর এবং এর চারপাশে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে'। এরকম কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে।
গত ৬ মার্চ ‘News24 BD’ নামক পেজ থেকে ছবিটি সহ একটি সংবাদের ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, “ই'রানিরা বিমানের ছবি এঁকে রেখেছে, আর তাতেই বো'মা পেলে ই'সরায়েল”(বানান অপরিবর্তিত)। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয়। প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
আলোচ্য ছবি থেকে কী-ফ্রেম সার্চ করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রানওয়ের টেক্সচার এবং গর্তের ধুলোবালির প্যাটার্ন খুব বেশি মসৃণ বা কৃত্রিম মনে হচ্ছে। সাধারণত এআই তৈরি ছবিতে বাস্তব দৃশ্যের চেয়ে নিখুঁত দৃশ্য পাওয়া যায়।
এআই তৈরি ছবির সমজাতীয় অসঙ্গতি পাওয়ার ফলে ছবিটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল দ্বারা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। নিখুঁত, সীমাবদ্ধতা কম থাকা, সহজলভ্যতা ও ক্ষেত্রবিশেষে বিনামূল্যে হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই তৈরি ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন--
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ ছবিটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
যদিও সার্চ করে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম Turkish Radio and Television Corporation (TRT) দ্বারা পরিচালিত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম TRT World -এর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দাবিটির সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিবেদনটির শেষে সংবাদমাধ্যমটি এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, '২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানি সামরিক অবস্থানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর প্রকাশিত কিছু ফুটেজ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র একটি ইরানি Mi-17 হেলিকপ্টারে আঘাত করলেও সেটি অদ্ভুতভাবে অক্ষত এবং স্থির রয়েছে, যা থেকে কোনো ধ্বংসাবশেষ বের হয়নি।
সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান শত্রুদের বিভ্রান্ত করতে এবং দামী ক্ষেপণাস্ত্র অপচয় করাতে মাটির ওপর ত্রিমাত্রিক ছবি (অ্যানামরফিক পেইন্টিং) বা নকল মডেল ব্যবহার করে থাকতে পারে। তবে কেউ কেউ পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন যে, সাধারণ ছবি থেকে তাপীয় সংকেত বা হিট সিগনেচার আসা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত এটি ইরানের প্রতারণা কৌশল নাকি নামমাত্র কোনো আক্রমণ, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।'
উল্লেখ্য পূর্ববর্তী কোনো দৃশ্য এআই দ্বারা ক্ষুদ্র কিংবা বড় ধরণের সম্পাদনার ফলেও ছবিটিকে এআই দ্বারা সম্পাদিত বা এআই তৈরি বলা হয়।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার বলে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




