জামায়াতের নারী কর্মী সাওদা সুমির বলে এআই তৈরি ছবি প্রচার
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, জামায়াত কর্মী সাওদা সুমির দাবিতে প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয় বরং এটি এআই এর সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

ভোলার জামায়াত কর্মী সাওদা সুমিকে গ্রেফতার ও পরে জামিনের সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করে ছবিটি সাওদা সুমির বলে প্রচার করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হিজাব ও চশমা পরিহিত এক নারী শাড়ি পরে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছেন। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, 'জামায়াতের নারী কর্মী সাওদা সুমি'। এ ধরনের পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে।
গত ৮ এপ্রিল 'Mohammad Shamsuddoha Tapos' নামক প্রোফাইল থেকে এরকম একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টটিতে একজন ব্যক্তি ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি কিনা তা জিজ্ঞেস করলে পোস্টকারী বলেন ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি নয়। পোস্টটির স্ক্রিনশট কোলাজ দেখুন —
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, দাবিটি সঠিক নয়। জামায়াত কর্মী সাওদা সুমিকে আটকের পর তার ছবি দাবিতে যে ছবিটি প্রচার করা হয়েছে সেটি আসল ছবি নয়। গুগলের SynthID শনাক্তকরণ টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
আলোচ্য ছবিটি রিভার্স সার্চ সহ বিভিন্নভাবে সার্চ করে করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ছবিটি পর্যবেক্ষণে কয়েকটি অসঙ্গতি পাওয়া যায়। বাম হাতের আঙুলগুলো অস্পষ্ট এবং একে অপরের সাথে মিশে গেছে বলে মনে হচ্ছে, যা এআই তৈরির একটি সাধারণ ত্রুটি। এছাড়াও, পেছনের সমুদ্রের পানি এবং পাথরের টেক্সচার কিছুটা কৃত্রিম মনে হচ্ছে, যা বাস্তব ছবির তুলনায় অনেক বেশি মসৃণ।
ছবিটিতে এআই–সৃষ্ট অসঙ্গতি ধরা পড়ার ফলে ছবিটিকে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী একটি টুল দিয়ে আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। নিখুঁত ফলাফল, তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্যতা ও বিনামূল্যের হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই দিয়ে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন --
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কোনো বাস্তব দৃশ্যকে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন সংস্করণের হুবহু একই ছবি তৈরি করলেও এই ধরণের কনটেন্টকে এআই তৈরি কনটেন্ট এবং এই ধরণের কোনো কনটেন্টে কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত) বা ব্যক্তির উপস্থিতি সহ কোনো কাজকে নকল করার চেষ্টা করা হলে তা ডিপফেক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য হয়।
সার্চ করে একটি ফেসবুক পোস্টে আলোচ্য ছবিটির মতো সাওদার চশমা ও একই ধরণের হিজাব পরিহিত আরো একটি ছবি পাওয়া যায়। ছবিটি বিভিন্ন টুলসে চেক করলে এআই দ্বারা তৈরি নয় (বাস্তব ছবি) হিসেবে ফলাফল পাওয়া যায়। এই বাস্তব ছবিটি কিংবা এই পোশাকে একই সময়ের কোনো একটি ছবি থেকেই আলোচ্য এআই ছবিটি তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। ফলে এটিকে আরো স্পষ্ট করে ডিপফেক ছবি বলা যায়। দেখুন --
অর্থাৎ সাওদা সুমির ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুকে এআই তৈরি ছবিকে বাস্তব ছবি বলে প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




