ফয়সাল করিম মাসুদ ও জুমার একসাথের দৃশ্য বলে এআই সম্পাদিত ছবি প্রচার
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ছবিটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে।

গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ (রাহুল নামে ভারতে অবস্থান করছিলেন) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ। এরপরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফয়সালের সাথে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। এরকম কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে।
গত ৮ মার্চ 'Mehedi Hasan' নামক প্রোফাইল থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত ভক্তি কখনোই ভাল না, সেটা সন্দেহের। হাদী হত্যার জন্য শুরু থেকেই জুমা মেয়েটাকে আমার সন্দেহ হয়েছিল। কারন সে হাদী নিয়ে অতিরিক্ত ভক্তি দেখিয়েছে। ... আজকে, শোনা যাচ্ছে, হাদী হত্যায় ফয়সাল নাকি, ঝুমার নাম বলছে ......(সংক্ষেপিত)। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ফয়সালের সাথে জুমার ছবিটি বাস্তব নয়। প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
ছবিটি নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে ছবিটি গত বছরের (২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর) ফেসবুকে 'Bappaditya Basu' নামক একটি প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। আলোচ্য হুবহু ছবিটি নিয়ে কী-ফ্রেম সার্চ করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এর দুদিন পূর্বে সাংবাদিক 'Zulkarnain Saer' -এর একটি পোস্ট পাওয়া যায় যেখানে কাছাকাছি একটি ছবি পাওয়া যায়। ছবিতে একই পোষাকে ফয়সালের সাথে জুমার স্থলে সহযোগী আলমগীর হোসেনকে দেখা যায়।
এই ছবিটির বিষয়ে 'Zulkarnain Saer' উল্লেখ করেন: সেসময়ের (১৩ ডিসেম্বর) রাতে কয়েকটি নম্বরে নিজেদের এই সেলফি পাঠান ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। যেসকল নম্বরে এই ছবিটি পাঠানো হয় তার একটি ইন্টারসেপ্ট করে এই ছবিটি পাওয়া যায়, ছবিটি ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে তোলা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
Bappaditya Basu এর ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট (ডানে) ও 'Zulkarnain Saer' -এর ফেসবুকে পোস্টের স্ক্রিনশটের (ডানে) তুলনামূলক চিত্র দেখুন --
বাম পাশের ছবিটিতে দেয়ালে নীল রঙের বর্ডারটি খুব বেশি কৃত্রিম বা 'পিক্সেল পারফেক্ট' মনে হচ্ছে, যা সাধারণ মোবাইল ক্যামেরায় কিছুটা নয়েজ থাকার কথা। সাধারণত এআই তৈরি ছবিতে বাস্তব দৃশ্যের চেয়ে নিখুঁত দৃশ্য পাওয়া যায়।
এআই তৈরি ছবির সমজাতীয় অসঙ্গতি পাওয়ার ফলে ছবিটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল দ্বারা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। একটি ছবিতে আলাদা কোনো ভিন্ন ব্যক্তিকে যুক্ত করা কিংবা ছবিতে কারো স্থলে ভিন্ন কাউকে প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। নিখুঁত, সীমাবদ্ধতা কম থাকা, সহজলভ্যতা ও ক্ষেত্রবিশেষ বিনামূল্যে হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই তৈরি ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবি দুইটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ফয়সালের সাথে জুমার ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
অপরদিকে 'Zulkarnain Saer' -এর ফেসবুক পোস্টে পাওয়া ছবিটি এই টুলে যাচাই করলে এতে SynthID ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি বলে ফলাফল দিয়েছে। আলোচ্য ছবিটির SynthID ফলাফল (বামে) এবং ফয়সাল-আলমগীরের ছবিটির (সেলফি) SynthID ফলাফলের (ডানে) চিত্র দেখুন --
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ ছবিটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদনা করে ফয়সালের সাথে থাকা আলমগীরের স্থলে জুমার ছবি যুক্ত করে দৃশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কোনো দৃশ্যে একজন ব্যক্তিকে এআইয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয় তাহলে সেই ধরনের কন্টেন্টকে এআই দ্বারা তৈরি হিসেবে উল্লেখ করার পাশপাশি আরো নির্দিষ্ট করে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি অথবা ডিপফেক কনটেন্ট বলা হয়।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার বলে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।




