করোনাভাইরাস, টিকা ও লকডাউন নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়াই ফেসবুকে অনুমাননির্ভর তত্ত্ব দিয়ে করোনার টিকা নিতে ও লকডাউন মানতে নিরুতসাহিত করা হচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে কিছু পেজ ও প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে যেখানে কোভিড ১৯ এর চলমান দ্বিতীয় ঢেউ এর সাথে করোনা ভ্যাকসিন ও লকডাউনের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় এই ঢেউ এর পিছনে কোভিড ১৯ এর ভ্যাকসিন দায়ী এবং করোনা নিয়ন্ত্রণে লকডাউন দেয়ার কোন কার্যকারিতা নেই।

আর্কাইভ করা আছে এখানে

মোটাদাগে ভাগ করলে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল থেকে করা পোস্টটির মূল দাবিগুলো এরকম:
১. করোনার বর্তমান ঢেউয়ের জন্য করোনা দায়ী নয়, বরং এর টিকা দায়ী।
২. বর্তমান ঢেউ নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরোপিত লকডাউনের কোন কার্যকারিতা নেই।
৩. এছাড়া পোস্টটিতে 'ন্যাচারাল করোনা', 'কৃত্রিম টীকা' এরকম কিছু অস্পষ্ট অভিধার ব্যবহার করা হয়েছে যার কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি।
ফ্যাক্ট চেক:
ফেসুবক ব্যবহারকারীরা বুম বাংলাদেশের কাছে পোস্টটির তথ্যের যথার্থতা জানতে চেয়েছেন।
বুম বাংলাদেশ পৃথকভাবে সবগুলো দাবির সত্যতা যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেছে।
প্রথম দাবি:
এখানে বলা হয়েছে করোনার বর্তমান ওয়েভ তথা ঢেউয়ের জন্য ন্যাচারাল করোনা দায়ী নয়, বরং করোনার টিকা দায়ী।
ন্যাচারাল করোনা বলতে কি বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। ধরে নেয়া যায় সার্স কোভ-২ এর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও দাবিটি সত্য নয়। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোভিডের যে ঢেউ চলছে তা করোনাভাইরাস এর কারণেই।
গত এক বছরে ভাইরাসটি প্রকৃতির মধ্যে মিউটেশন ঘটিয়ে তার কয়েকটি ভ্যারিয়েন্ট বিকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়েন্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট, এবং ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট। ভাইরাসের জিনে যখন পরিবর্তন হয়, তখন তাকে 'মিউটেশন' বা রূপান্তর বলা হয়। সব ভাইরাসই কিছু না কিছু রূপান্তর ঘটিয়ে চলে। তবে যখন কোনো রূপান্তরের কারণে একটি ভাইরাস দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায় বা অধিকতর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তখন বিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে সতর্ক করে থাকেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশে কোভিড ১৯ এর আকস্মিক সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ভাইরাসটির যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট দায়ী বলে সিএইচআরএফ ও আইসিডিডিআর,বি এর গবেষণা সূত্রে জানা যায়। দেখুন
এখানে
এখানে
তাছাড়া ফেসবুক পোস্ট যে বা যারা এই দাবিটি করেছেন তারাও স্বীয় দাবির পক্ষে কোন সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন নি।
দ্বিতীয় দাবি:
এক্ষেত্রে বলা হয়েছে বর্তমান ঢেউ নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরোপিত লকডাউনের কোন কার্যকারিতা নেই।
এই দাবিটিও সত্য নয়। কারণ এখন পর্যন্ত যেসব দেশ সময়মতো লকডাউন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি আরোপের নীতি অবলম্বন করেছে সেখানে করোনার থাবা কম দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরী অব মেডিসিনের একটি জার্নালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত গবেষণাটি দেখুন এখানে
তাছাড়া এবছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশে কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ আকস্মিক বৃদ্ধি পেলে গত ৭ এপ্রিল একদিনে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭৬২৬ জন সংক্রমিত হন। তবে সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা যায় গত ৫ এপ্রিল থেকে আরোপিত লকডাউনের উপযোগিতায় নতুন করে সংক্রমণের সংখ্যা গতকাল ২২ এপ্রিল ছিল ৪০১৪ জন। এ সংক্রান্ত দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনটি দেখুন
এখানে
এছাড়াও ফেসবুক পোস্টটিতে বাতাসে করোনা ছড়ানোর কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত এক 'কমেন্টে' গবেষকরা নভেল করোনাভাইরাস বা সার্স-কোভ-২ মূলত বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। গত মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একটি গবেষণা স্পন্সর করে যার ফলাফলে বলা হয় যে, কিছু পরীক্ষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোভিড-১৯-এর বায়ুবাহিত সংক্রমণের ব্যাপারে সুনিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। ল্যানসেটের সাম্প্রতিক লেখাটি মূলত সেই গবেষণার উপর একটি 'কমেন্ট' যেখানে দশটি কারণ দেখানো হয়েছে যা থেকে ধারণা করা যায় কোভিড-১৯-এর বায়ুবাহিত সংক্রমণের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে।
ল্যানসেটের লেখার উপসংহারে এটিও বলা হয়েছে যে, ''There is consistent, strong evidence that SARS-CoV-2 spreads by airborne transmission. Although other routes can contribute, we believe that the airborne route is likely to be dominant. The public health community should act accordingly and without further delay."।

অর্থাত বায়ুবাহিত সংক্রমণ ছাড়াও অন্যান্য উপায়ে সংক্রমণ হতে পারে।
দেখুন এখানেএখানে
তবে এর সাথে লকডাউনের কোন সম্পর্ক নেই। বরং বিশেষজ্ঞদের মত হলো, যদি সংক্রামক ভাইরাসটি বায়ুবাহিত হয়, তবে করোনা রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস, কথা বলা, বা হাঁচি দেওয়ার সময় অন্যরা যদি একই বাতাসে শ্বাস নেয়, তবে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
সেক্ষেত্রে বায়ুবাহিত এ রোগটির নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মধ্যে রয়েছে- সুষ্ঠু বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা, ভিড় কমানো, আবদ্ধ ঘরে কম থাকা, মাস্ক পরা, মাস্কের গুণগত মান যাচাই করে নেওয়া, মুখের আকারের সঙ্গে সঠিক মাপের মাস্ক পরা ও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে কাজ করার সময় স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) ব্যবস্থা করা।

আর এসব নিশ্চিত করতে লকডাউন একটি সহায়ক পদক্ষেপ। যদিও নিম্ন আয়ের মানুষের উপর লকডাউনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা আছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

তৃতীয় দাবি:
ফেসবুক পোস্টটিতে ন্যাচারাল করোনা, কৃত্রিম টিকা প্রভৃতি যেসব অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে বুম বাংলাদেশ কোথাও এধরণের নির্ভরযোগ্য তত্ত্বের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পায় নি। ফেসবুকেও এর স্বপক্ষে কোন সুস্পষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়নি।
Claim Review :   বর্তমানে যে ওয়েভ যাচ্ছে সেটার জন্য ন্যাচারাল করোনা দায়ী না, দায়ী টিকা
Claimed By :  Facebook posts
Fact Check :  Misleading
Show Full Article
Next Story