কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় রেমডেসিভির কতটা কার্যকর?

এন্টিভাইরাল ড্রাগ রেমডেসিভির-কে 'বিশ্বে করোনার একমাত্র কার্যকর ওষুধ বলে স্বীকৃত' বলে দাবি করেছে বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানি

দৈনিক প্রথম আলো গত ৮ মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম, "করোনার চিকিৎসায় দেশে প্রথম রেমডেসিভির উৎপাদন করল এসকেএফ"।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা কিছু তথ্য এবং ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ'র কর্তৃপক্ষীয় একজন ব্যক্তি ও একজন বিশেষজ্ঞের কিছু দাবির ফ্যাক্ট চেক করেছে বুম বাংলাদেশ।



দাবি ১:

প্রথম আলোর প্রতিবেদনটির প্রথম বাক্যটি হচ্ছে--

"করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর ওষুধ রেমডেসিভির উৎপাদন সম্পন্ন করেছে দেশের খ্যাতনামা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।"

প্রতিবেদনের দ্বিতীয় প্যারায় লেখা হয়েছে--

"এসকেএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, 'করোনা পরিস্থিতি নিয়ে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা দেশবাসীকে এই সুখবর দিতে চাই যে বিশ্বে করোনার একমাত্র কার্যকর ওষুধ বলে স্বীকৃত জেনেরিক রেমডেসিভির উৎপাদনের সব ধাপ আমরা সম্পন্ন করেছি।'

ফ্যাক্ট চেক:

আমরা এখানে প্রথমে যাচাই করে দেখবো, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় রেমডেসিভির আসলে কতটা কার্যকর ওষুধ?

এবং আরও যাচাই করবো যে, রেমডেসিভির "বিশ্বে করোনার একমাত্র কার্যকর ওষুধ বলে স্বীকৃত" কিনা?

কভিড-১৯ চিকিৎসায় রেমডেসিভির কতটা কার্যকর?

এন্টিভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভির কভিড-১৯ চিকিৎসায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তা বুঝার জন্য এখন পর্যন্ত তিনটি ট্রায়াল হয়েছে; যার মধ্যে একটি করা হয়েছে চীনের উহানে এবং দুটি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

চীনে করা ট্রায়ালটির ফলাফল ইতোমধ্যে পিয়ার-রিভিউর পর জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে করা দুটি ট্রায়ালের একটি করেছে দেশটির National Institute of Allergy and Infectious Diseases (NIAID); আর অন্যটি করেছে রেমডেসিভির এর উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান গিলিয়েড সাইন্সেস। (রেমডেসিভির মূলত ইবোলা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়)।

এর মধ্যে চীনের উহানে করা ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে, রেমডেসিভির যেসব রোগীর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে তারা কিছুটা আগে সেরে উঠেছেন। তবে ওই ট্রায়ালে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, রেমডেসিভির গ্রহণকারী রোগী এবং যারা গ্রহণ করেন নি তাদের সেরে ওঠার সময়ের যে পার্থক্য তা "পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ নয়"।

ট্রায়ালের ওপর প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে--

"Although not statistically significant, patients receiving remdesivir had a numerically faster time to clinical improvement than those receiving placebo among patients with symptom duration of 10 days or less (hazard ratio 1·52 [0·95–2·43])."

চীনে করা এই ট্রায়ালের দুর্বলতার দিক হলো, এটি অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক রোগীর ওপর (২০০) চালানো হয়েছে, এবং শেষ দিকে রেমডেসিভির প্রয়োগযোগ্য রোগীর অভাবের কারণে ট্রায়ালটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সমাপ্ত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে NIAID এর পরিচালিত ট্রায়ালটি সবচেয়ে বড় সংখ্যক (১ হাজারে বেশি) রোগীর ওপর চালানো হয়েছে; যার চূড়ান্ত ফলাফল মে মাসের শেষের দিকে প্রকাশিত হবে।

তবে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে দেখ গেছে, রেমডেসিভির গ্রহণকারী রোগীরা ওষুধটি গ্রহণ না করা রোগীদের চেয়ে গড়ে ৪ দিন আগে সেরে ওঠেছেন। অর্থাৎ, গ্রহণকারীদের সেরে ওঠার গতি ৩১ শতাংশ বেশি। আর মৃত্যুর হার রেমডেসিভির গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলো ৮ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ছিলো ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।

হোয়াইট হাউজের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফাউসি আক্রান্তদের সেরে ওঠার সময় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রেমডেসিভিরের কার্যকারিতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও মৃত্যু হার কমানোর ক্ষেত্রে এটির কার্যকারিতা নিয়ে বলেছেন, "the mortality benefit of remdesivir "has not yet reached statistical significance."

অর্থাৎ, মৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে রেমডিসিভিরের ভূমিকা এখন পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

এর বাইরে গিলিয়েড-এর ট্রায়াল এখনও চলছে। গত ২৯ মে প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে তাদের চলমান ট্রায়ালের প্রাথমিক ফলাফল ইতিবাচক বলে দাবি করেছে।

যদিও তাদের এই দাবির বিষয়ে Nature ম্যাগাজিন এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে--

"The drug's maker, Gilead Sciences of Foster City, California, announced on the same day that in its own trial, more than half of 400 participants with severe COVID-19 had recovered from their illness within two weeks of receiving treatment. But the study lacked a placebo-controlled arm, making the results difficult to interpret."


রেমডেসিভির কি "বিশ্বে করোনার একমাত্র কার্যকর ওষুধ বলে স্বীকৃত"?

এসকেএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন হোসেন দাবি করেছেন, রেমডিসিভির "বিশ্বে করোনার একমাত্র কার্যকর ওষুধ বলে স্বীকৃত"।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাস গোত্রের কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর বলে স্বীকৃত কোনো ওষুধ নেই।

বেশ কয়েকটি এন্টিভাইরাল ড্রাগ সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সীমিত আকারে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, ফ্যাভিপিরাভির (অ্যাভিগান) এবং রেমডেসিভির সবচেয়ে আলোচিত তিনটি ওষুধ।

গত ১ মে মার্কিন Food and Drug Administration (FDA) রেমডেসিভিরকে কভিড-১৯ চিকিৎসায় 'জরুরি ব্যবহার অনুমোদন' (emergency use authorization) দিয়েছে।

কিন্তু এর আগে গত ২৮ মার্চ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এর ক্ষেত্রে একই ধরনের 'জরুরি ব্যবহার অনুমোদন' দিয়েছিলো এফডিএ।

এছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা চিকিৎসায় জাপানি কোম্পানির তৈরি ফ্যাভিপিরাভির-ও কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। জাপানে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এটির ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলমান। এবং চীনের একটি গবেষণায় এই ওষুধের কার্যকারিতা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।


দাবি ২:

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে--

"যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) গত সপ্তাহে করোনার ওষুধ হিসেবে রেমডেসিভিরকে ব্যবহারের অনুমোদন দেয়।"

ফ্যাক্ট চেক:

উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ১ মে মার্কিন Food and Drug Administration (FDA) রেমডেসিভিরকে কভিড-১৯ চিকিৎসায় 'জরুরি ব্যবহার অনুমোদন' (emergency use authorization) দিয়েছে।

Emergency Use Authorization কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। বরং জরুরি পরিস্থিতি কোনো অপ্রমাণিত ওষুধ ব্যবহারের জন্য এটি দেয়া হয়ে থাকে। পরীক্ষাধীন কোনো ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত ফলাফল প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকে।

Nature এর প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে--

"The FDA's authorization is not a final drug approval, and can be revoked when the conditions required for emergency use are no longer in effect."

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি।

এছাড়া আরেকটি তথ্যও উপরে উল্লেখ করা হয়েছে; তা হলো: রেমডেসিভিরই একমাত্র এন্টিভাইরাল ড্রাগ নয় যেটি কভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য Emergency Use Authorization পেয়েছে। একই অনুমোদন পেয়েছে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নামক ম্যালেরিয়ার ওষুধটিও।

দাবি ৩:

প্রথম আলো অধ্যাপক বিল্লাল আলম বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কোনো ওষুধের অনুমতি দিতে অন্তত ছয় মাস সময় নেয়। কিন্তু ওষুধটির কার্যকারিতা দেখে দ্রুত অনুমতি দিয়েছে।"

ফ্যাক্ট চেক:

এখানে অধ্যাপক বিল্লালের বক্তব্যটি সঠিক। কিন্তু তিনি যা বলেন নি তা হলো, কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের "দ্রুত অনুমতি" পাওয়া একমাত্র ওষুধ নয় রেমডেসিভির। 'কার্যকারিতা দেখে দ্রুত অনুমতি' আরও একটি ওষুধকেও দেয়া হয়েছে; আর সেটি হলো হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন।

দাবি ৪:

রেমডেসিভিরের প্রশংসা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সীতেশ চন্দ্র বাছাড় এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, "রেমডেসিভির ওষুধটি ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে দারুণ কার্যকর ছিল।"

ফ্যাক্ট চেক:

গত ১ মে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইবোলা চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেমডেসিভিরকে 'ফেইল্ড ড্রাগ' বা ব্যর্থ ওষুধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে--

"Remdesivir, an antiviral drug designed to treat both hepatitis and a common respiratory virus, seemed fated to join thousands of other failed medications after proving useless against those diseases."

আরও বলা হয়েছে--

"the drug failed a number of real-life tests, not just against hepatitis but also against Ebola in Africa. The drug languished, unapproved for any use — until a new coronavirus emerged."

গত ২৩ এপ্রিল দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইবোলা চিকিৎসায় রেমডিসিভির এর ব্যর্থতার বিষয়ে বলা হয়েছে--

"The drug, made by the US company Gilead Sciences, is an antiviral that was trialled in Ebola, but which failed to show benefits in Africa."

৭ মে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে--

"Remdesivir, which previously failed as a treatment for Ebola, is designed to disable the ability by which some viruses make copies of themselves inside infected cells."

Show Full Article
Next Story