'কার দোষ': যেমন করে খোঁজা হচ্ছে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায়

সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে হেফাজতে ইসলামকে এককভাবে দায়ী হিসেবে দেখানো হয়, আর সোশ্যাল মিডিয়াতে চলে একেক পক্ষে একেক প্রচারণা

গত ১৭ মার্চ বুধবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় নোয়াগাঁও গ্রামের এক যুবকের বিরুদ্ধে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে কটূক্তি করে ফেসবুক পোস্ট দেয়ার অভিযোগ তুলে সেখানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা করা হয়। আশপাশের গ্রামগুলোর কয়েক শত মানুষ জড়ো হয়ে এ হামলা চালান বলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে। ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

এ ঘটনার পরপর মূলধারার মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে সরব হন সমাজের নানান স্তরের মানুষ, নানান রাজনৈতিক পক্ষ।

আমরা এই লেখায় দেখার চেষ্টা করবো হামলার ঘটনার জন্য দায়ী কারা- তা নির্ধারণে কিভাবে মিডিয়ায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একধরনের লড়াই চলেছে গত কদিন ধরে, এবং এর মাধ্যমে কিভাবে তথ্যগত বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।

মিডিয়ার খবরে এককভাবে হেফাজত দায়ী:

শাল্লার ঘটনায় ১৭ মার্চ বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, "সুনামগঞ্জে হিন্দু গ্রামে হেফাজত ইসলাম সমর্থকদের হামলা, ভাংচুর, লুটপাট"।

একই দিন ডেইলি স্টার এর বাংলা ভার্সন এর শিরোনাম, "সুনামগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হেফাজত সমর্থকদের হামলা"

১৮ মার্চ দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবরের শিরোনাম, "নোয়াগাঁওকে আরেক রামু বানাল হেফাজত"

সমকালের স্ক্রিনশট--


দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম, "সুনামগঞ্জে হেফাজত-সমর্থকদের হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট"

কালের কণ্ঠের শিরোনাম, "শাল্লায় হিন্দু গ্রামে হামলা মামুনুল অনুসারীদের"

উপরের শিরোনামগুলোর মতো আরও অনেক সংবাদমাধ্যমে এমন উপসংহারমূলক শিরোনাম করা হয়েছে। এবং মূল প্রতিবেদনে ঘটনার জন্য এককভাবে হেফাজতে ইসলাম এবং তাদের সমর্থকদেরকে দায়ী করা হয়েছে। সূত্র হিসেবে মূলত পুলিশকেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী বা ভিকটিমদের বক্তব্যও সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

উপরে উল্লিখিত সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনার পেছনের একমাত্র কারণ হিসেবে "মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তিমূলক পোস্ট' এবং একমাত্র দায়ী হিসেবে "হেফাজত ইসলাম" বা "হেফাজত অনুসারী" বা "মামুনুল হকের অনুসারী" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া ঘটনার অন্য কোনো সম্ভাব্য কারণ বা দায়ী পক্ষ থাকতে পারে এমন কোনো সন্দেহের কথাও উপরিউক্ত কোনো প্রতিবেদনে ছিলো না। উপরিউক্ত প্রতিবেদনগুলো পড়ে একজন পাঠক যে ধারণাটি পাবেন তা হলো: "মামুনুল হককে নিয়ে এক হিন্দু যুবক কটুক্তিমূলক ফেসবুক পোস্ট করেছেন। এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে স্থানীয় হেফাজতে ইসলাম ও তার অনুসারীরা। এরপর স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে উস্কে দিয়ে সেখানকার হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটায় হেফাজতে ইসলাম।"

অর্থাৎ, পুরো বিষয়টি এককভাবে হেফাজতে ইসলাম দ্বারা পরিকল্পিত ও সংঘটিত একটি শতভাগ সাম্প্রদায়িক হামলা। এরবাইরে আর কোনো পরিপ্রেক্ষিত মিডিয়ার রিপোর্টিংয়ে ছিলো না।

এক্ষেত্রে বিডিনিউজের শিরোনামটি একটু ভিন্ন ছিলো। "সুনামগঞ্জে হিন্দু বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ হেফাজতের বিরুদ্ধে" শিরোনামে উপসংহারমূলকভাবে হেফাজতকে দায়ী না করে 'হামলার অভিযোগ হেফাজতের বিরুদ্ধে' বলে খবর পরিবেশন করা হয়েছে। যদিও প্রতিবেদনের ভেতরে পুলিশের বরাতে এককভাবে হেফাজতের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনার অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিতে থাকতে পারে তেমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ ছিলো না।

আবারও উল্লেখ্য, অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর থেকে বিডিনিউজের রিপোর্টিংয়ের আলাদা বৈশিষ্ট্যটি হলো, অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোতে 'হামলা করেছে হেফাজত/অনুসারীরা' এভাবে সিদ্ধান্তমূলকভাবে খবর পরিবেশন করা হলেও বিডিনিউজ অভিযোগ আকারে পরিবেশন করেছে।

মিডিয়া রিপোর্টের প্রেক্ষিতে এরপর সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই (যারা হেফাজতবিরোধী হিসেবে পরিচিত) হেফাজতকে এককভাবে দায়ী করে পোস্ট দিতে থাকেন। তাদের আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো হেফাজতে ইসলাম। উদাহরণস্বরূপ দুটি পোস্ট দেখুন এখানে এখানে


আওয়ামী কানেকশন খোঁজার চেষ্টা:

মিডিয়া রিপোর্টে এককভাবে হেফাজতে ইসলামের দায় ফুটে উঠলেও এবং এর প্রেক্ষিতে ফেসবুকেও অনেকে হেফাজতকে তীরবিদ্ধ করলেও আরও কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারী চেষ্টারত ছিলেন ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগের কানেকশনটি কোথায় তা বের করতে। তার অংশ হিসেবে একটি ভুল ছবিকেও 'প্রমাণ' হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে কাউকে কাউকে। যেমন নিচে একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট দেখুন-

ছবিযুক্ত পোস্টের ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, "এই ছবিসহ ডেইলি স্টারে একটি খবর ছাপা হয়েছে; শিরোনাম- "সুনামগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হেফাজত সমর্থকদের হামলা"। ছবিতে হেফাজতের লোকদের মাঝে নেতা গোছের একজনকে দেখা যাচ্ছে বিখ্যাত পোষাক পরিহিত অবস্থায়। উনার পরিচয় কী?"

এখানে পোস্টকারী ইঙ্গিত করেছেন যে, "সুনামগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হেফাজত সমর্থকদের হামলা" বলে ডেইলি স্টার যে ক্যাপশন দিয়েছে তাতে ছবিটিতে দেখা যাওয়া সব মানুষকেই 'হামলাকারী' হিসেবে বুঝিয়েছে ডেইলি স্টার। এবং সেই "সব হামলাকারীদের' মধ্যে যেহেতু মুজিবকোট পরিচিত একজনকে দেখা যাচ্ছে, এতে হামলায় আওয়ামী কানেকশন প্রমাণিত হয়।"

"সংগৃহীত" এর বরাতে ডেইলি স্টারের ছবি ও ক্যাপশন দেখুন এখানে

একই ছবি দৈনিক সমকাল তাদের নিজেদের ছবি হিসেবে প্রকাশ করেছে এবং ক্যাপশন দিয়েছে এভাবে, "সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে বুধবার ইউএনও আল মুকতাদির হ্যান্ডমাইকে হামলাকারীদের সঙ্গে কথা বলছেন -সমকাল"

অর্থাৎ, ছবিটিতে দেখা যাওয়া মানুষগুলোর একাংশ হামলাকারী। এবং তাদের শান্ত করতে ঘটনাস্থলে যাওয়া ইউএনও এবং অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাও ছবিতে রয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি এবং তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ইউএনও এর পাশে মুজিবকোট পরিহিত ব্যক্তিটি শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (আল আমিন চৌধুরী)। হামলার পরে তিনি ইউএনও-সহ অন্যান্যদের সাথে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানের পোস্টে যেমন ডেইলি স্টারের অস্পষ্ট ক্যাপশনের সাহায্য নিয়ে তাকে 'হামলাকারী' হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে তিনি তেমন হামলকারী নন।


হামলা ও ভাঙচুরের অপরাধকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা:

এদিকে আরও কিছু মানুষ (যারা হেফাজত ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট) ফেসবুকে চেষ্টারত ছিলেন কিভাবে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনাটিকে লঘু অপরাধ এবং একইসাথে 'হিন্দু যুবকের করা কটুক্তিকে' বড় অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা যায়। নিচের যে ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট দেয়া হলো সেটি মাওলানা এহসানুল হক নামে একজনের। জনাব এহসানুল হক হলেন হেফাজত নেতা মাওলানা মামুনুল হকের ভাগিনা। ২৫ হাজারের বেশি ফেসবুক ফলোয়ার থাকা মাওলানা এহসানুল হকের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশটে লাল চিহ্নিত বাক্যগুলো খেয়াল করুন।

তিনি লিখেছেন, "ঝুমন দাস আপন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম মাওলানা মামুনুল হক এর বিরুদ্ধে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করে"। অন্যদিকে হামলাকারীদের বিষয়ে লিখেছেন, "স্থানীয় কিছু আবেগী জনতা লাঠিসোঠা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াপাড়ায় হামলা করে। কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়।"

অর্থাৎ, ফেসবুকে কাউকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার কাজটিকে তিনি 'ধৃষ্টতাপূর্ণ' বলে নিন্দা করলেও তার প্রতিক্রিয়ায় কারো (একজন নয়, অনেকের) বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করার মতো ফৌজদারি অপরাধকে 'আবেগী জনতা'র কাজ বলে অভিহিত করেছেন। তার কাছে ফেসবুকে করা মন্তব্যটিকে 'আবেগী যুবকের কাজ' এবং হামলা-ভাঙচুরের অপরাধকে 'ধৃষ্টতাপূর্ণ' বলে মনে হয়নি।

তার একই পোস্টে মাওলানা এহসানুল হক আরও লিখেছেন, "দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, সবশ্রেণীর মানুষের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হিন্দু কতৃর্ক ধৃষষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে ধর্মপ্রাণ মানুষ ফুসে উঠবে এটা খুব স্বাভাবিক। আবেগী জনতার কর্মকান্ডে কিছু বাড়াবাড়িও হতে পারে।"

এখানে নিরাপরাধ মানুষের বাড়িঘরে হামলা ভাঙচুরের মতো ঘটনাকে 'ধর্মপ্রাণ মানুষ ফুসে উঠা' এবং 'আবেগী জনতার কিছু বাড়াবাড়িও' হিসাবে অভিহিত করার মাধ্যমে মূলত অপরাধীদের অপরাধকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

মাওলানা এহসানুল হকের এমন দুটি পোস্টের লিংক আর্কাইভ করা আছে এখানে এখানে

কওমী মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট একটি জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালে (আওয়ার ইসলাম) ১৭ মার্চ একই রকমভাবে একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, "আলেমদের বাধা উপেক্ষা করে হিন্দুদের বাড়িঘর ঘেরাও করলো আবেগী জনতা"



সর্বশেষ আপডেটে স্থানীয় বিরোধ ও ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টতার খবর:

প্রথমে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এককভাবে ঘটনার জন্য হেফাজতে ইসলামকে (এবং অনুসারীদের) দায়ী করে সিদ্ধান্তমূলক শিরোনামে খবর করলেও ধীরে ধীরে ভিন্ন ধরনের তথ্যও সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে।

১৯ মার্চ দৈনিক যুগান্তর "বেরিয়ে এলো হিন্দু গ্রামে হামলার আসল রহস্য (ভিডিও)" শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে আক্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভিডিও বক্তব্য নেয়া হয়। সেখানে ভিকটিমরা দাবি করছেন স্থানীয় এক ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতার সাথে কয়েকজন হিন্দু ব্যক্তির বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। ফেসবুক পোস্টকে উপল্যক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিডিনিউজের ২০ মার্চের "শাল্লায় হিন্দুদের গ্রামে হামলা: 'মূল আসামি' স্বাধীন মেম্বার গ্রেপ্তার" শিরোনামের খবরে বলা হয়েছে, "শহীদুল ইসলাম স্বাধীনের বাড়ি শাল্লার পাশের দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামে। তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য।"

যুগান্তরের আরেক প্রতিবেদনের শিরোনাম, "হিন্দু গ্রামে হামলা: প্রধান আসামি যুবলীগ নেতা স্বাধীন মেম্বার গ্রেফতার"

বাংলানিউজের "শাল্লায় হামলার ঘটনায় প্রধান আসামি গ্রেফতার" শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে হবিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল প্রথম মামলাটি করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় দিরাইয়ের তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম স্বাধীনকে। শহীদুল ইসলাম স্বাধীনের বাড়ি শাল্লার পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামে। তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য।"

Updated On: 2021-03-20T18:28:55+05:30
Show Full Article
Next Story