'খ্রিষ্টানদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে' শাইখ আসরার কি বিষপান করেছিলেন?

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে একজন মুসলিম ধর্মপ্রচারক বিতর্ক চলাকালীন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিষপান করেন

"আজওয়া খেজুরের বরকতে বিষ হয়ে গেল পানি" এমন শিরোনামে একটি ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করা হয়েছে "Islam Pratidin। ইসলাম প্রতিদিন" নামে একটি ফেসবুক পেইজে।

৯ মার্চ (২০২০) তারিখে আপলোড করা ভিডিওটি ১৬ মার্চ পর্যন্ত ৬৫ হাজারবার 'শেয়ার' এবং ৯ লাখ ৯৩ হাজারবার 'ভিউ' হয়েছে।



এছাড়াও এই একই দাবি করে ভিডিওটি আরও বহু ফেসবুক পেইজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা হয়েছে গত কয়েকদিনে। এগুলোর কোনো কোনোটি লক্ষাধিকবার 'ভিউ' হয়েছে।

"Islam Pratidin। ইসলাম প্রতিদিন" এর ভিডিও ক্লিপটির সাথে ক্যাপশন হিসেবে নিচের কথাগুলো লেখা হয়েছে--

"খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ এক বির্তকমূলক আয়োজনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে জনসম্মুখে ইঁদুরের বিষ পান করার পরও বহাল তবিয়তে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার শাইখ আসরার রাশীদ।

অবিশ্বাস্য এই ঘটনাটি ঘটেছে ব্রিটেনে। সম্প্রতি খ্রিস্টানদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বির্তকমূলক সভায় খ্রিস্টানরা বলেছিল, 'আপনাদের নবী তো বলেছে আজওয়া খেজুর খেয়ে বিষ খেলেও বিষ কাজ করবে না। তো সেটা প্রমাণ করে দেখান।' খীস্টানদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সবার সামনে দাড়িয়ে ইঁদুরের ঔষুধ বা বিষ পান করেছেন শাইখ আসরার কিন্তু তার কিছুই হয়নি। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।"


অরিজিনাল ভিডিও:

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটি পোস্ট-ভেদে ২ থেকে ৫ মিনিট দীর্ঘ। "Islam Pratidin। ইসলাম প্রতিদিন" পেইজের ক্লিপের দৈর্ঘ্য ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ড।

এসব ক্লিপের মূল ভিডিওটি ২ ঘণ্টা ২৯ মিনিট দীর্ঘ এবং সেটি 'Asrar Rashid - Official' নামে একটি ইউটিউবে চ্যানেলে ২১ ফেব্রুয়ারি আপলোড করা হয়েছে। Asrar Rashid - Official চ্যানেলে ভিডিওটির ডেসক্রিপশনের শুরুতে লেখা ডিসক্লেইমার জুড়ে দেয়া হয়েছে, "DISCLAIMER: no one try taking poison!"

তাতে আরও জানানো হয়, বিতর্কটি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়। মদিনা সোসাইটি নামক একটি সংস্থার আয়োজনে তাতে অংশ নেন শাইখ আসরার রশিদ এবং Hatun Tash ও Caleb Courneloup নামে দুইজন খ্রিষ্টান এপোলোজেটিক্স।

দেখুন এই লিংকে

অরিজিনাল ভিডিওর ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিটের পর থেকে শাইখ আসরারের কথিত 'বিষপান' এর বিষয়টি রয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, বিতর্কে অংশ নেয়া হাতুন তাশ এক পর্যায়ে আসরার রশিদকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, "I would love to know actually if you can drink that poison. Because, remember guys, what Muhammad says, 'just drink the poison, get a date, it should ... (পরের শব্দটি স্পষ্ট নয়)"

এর প্রেক্ষিতে আসরার চেয়ার থেকে উঠে টেবিলে রাখা একটি বোতল থেকে কিছু পানীয় পান করেন। তখন প্রশ্নকারী বলেন, "কেউ তাকে একটি খেজুর দেন, এবং এটা চেক করে দেখেন যে এটা আসলেই বিষ কিনা। নাকি কোনো ধরনের প্রতারণা হচ্ছে এখানে..."।

শাইখ আসরার যে বোতল থেকে পানীয় গ্রহণ করেছিলেন সেটিতে আসলেই বিষ ছিল কিনা, কিম্বা থাকলে সেটা কী ধরনের বিষ এবং কতটা বিষাক্ত ছিল, এবং তা মানবদেহে ওই ধরনের 'বিষ' এর প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়ার কথা ছিল- এসব বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য বা প্রমাণ ভিডিওতে নেই; এবং পরবর্তীতেও কেউ তা উপস্থাপন করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তবে ঘটনাস্থলে শাইখ আসরার, উপস্থিত অন্য বিতার্কিক, মডারেটর এবং উপস্থিত দর্শকদের আচরণ ও বক্তব্যে এমনটা সন্দেহ হওয়ার যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায় যে, বোতলে তেমন বিষাক্ত কিছু ছিল না।

বিশ্লেষণ:

প্রথমত, স্টেজে উপস্থিত আলোচক ও বিতার্কিকরা আসরারে সামনে 'বিষের বোতল' থাকার পরও এবং সেটি থেকে 'বিষপান' করার বিষয়টিকে মোটেও সিরিয়াস কিছু হিসেবে নেননি। বরং তারা অনেকটা কৌতুকচ্ছলে উপভোগ করেছেন। সত্যিকারের কোনো বিষাক্ত পদার্থ বোতলে থাকলে এবং অন্যের উস্কানির প্রেক্ষিতে (বিতার্কিক হাতুন তাশের) সেটি কেউ পান করে মৃত্যুবরণ করলে 'আত্মহত্যায় সহায়তা'র অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারতেন স্টেজে থাকা ব্যক্তিরা। সাধারণবোধ থেকে অনুমান করা যায়, এমন অবস্থায় স্টেজে থাকা ব্যক্তিরা আসরারকে 'সত্যিাকারে বিষ' পান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন; অথবা মডারেটর সামনের টেবিলে 'বিষের বোতল' রাখার বিষয়টিই অনুমোদন করতেন না।

দ্বিতীয়ত, শাইখ আসরার তার কথিত 'বিষপান' এর বিষয়টি নিয়ে একটু পরেই (২ ঘণ্টা ১৮ মিনি ২৭ সেকেন্ডের পর) কৌতুক করাটা অস্বাভাবিক। দর্শক সারি থেকে একজনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে নিজের বক্তব্য গুছিয়ে উঠতে না পেরে কৌতুকচ্ছলে আসরার বলেন, ""...a few more points but I cannot remember... may be the poison is taking it's effect..."

অর্থাৎ, "আরও কয়েকটি পয়েন্ট আমি মনে করতে পারছি না। সম্ভবত বিষের কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে...।"

তার এমন কৌতুকে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন। এরপর আসরার তার বক্তব্য শেষ করেন।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আসরার দৃঢ়ভাবে এটা বিশ্বাস করেন এবং প্রমাণ করতে চান যে, আজওয়া খেজুর (হাদিস মতে) বিষের কার্যকারিতা নষ্ট (বা কমিয়ে দেয়)। এমনটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেই তিনি 'বিষপান' করলেন। এমন অবস্থান গ্রহণের পর কিছুক্ষণ পরেই 'সম্ভবত বিষের কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে...' কথাটি বলার সুযোগ তার নেই। এটি বললে বিতর্কে তার অবস্থানেরই ভিত্তি থাকে না।

তৃতীয়ত, এমন কৌতুকের পর মডারেটর আসরারকে মুচকি হেসে প্রশ্ন করেন, "এটা কি সত্যিই বিষ?" জবাবে, 'হ্যাঁ', বা 'না' উত্তর না দিয়ে আসরার কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, "Do you see it's a matter of faith. This is a matter of faith." (অর্থাৎ, আপনি কি জানেন এটা বিশ্বাসের ব্যাপারে। এটা একটা বিশ্বাসের ব্যাপার।)।

চতুর্থত, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আসরার শুধু বোতল থেকে কথিত বিষাক্ত পানীয় গ্রহণ করছেন, কিন্তু প্রশ্নকারী যেভাবে হাদিস বর্ণনা করে 'আজওয়া' নামক খেজুর খাওয়ার কথা বলেছেন সে অনুযায়ী কোনো খেজুর খান নি শাইখ আসরার। যেহেতু হাদিসে বিষের কার্যকারিতা নষ্টের সাথে আজওয়া খেজুর খাওয়ার শর্ত জুড়ে দেয়া আছে, সেহেতু শুধু 'বিষপান' করে আজওয়া না খেলে বিষের কার্যকারিতা বলবৎ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, (আজওয়া) খেজুর না খাওয়ার পরও বিষ পান করে 'সুস্থ' আছেন পানকারী! অথচ এই বিষয়টিকেই বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে "আজওয়া খেজুরের বরকতে বিষ হয়ে গেল পানি" বলে প্রচার করা হচ্ছে; যা বাস্তবে ভুল দাবি।

পঞ্চমত, পুরো ভিডিও নিজের ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করে শাইখ আসরার রশিদ ডিসক্লেইমার যুক্ত করেছেন, "DISCLAIMER: no one try taking poison!" তিনি যদি সত্যিকার অর্থে বিষপান করে খেজুর খাওয়ার মাধ্যমে সেই বিষের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায় বলে মনে করতেন, এবং বিতর্ক অনুষ্ঠানে সত্যিই বিষ খেয়ে বর্তমানের মতো সুস্থ থাকতেন তাহলে এই ডিসক্লেইমার যুক্ত করার প্রয়োজন ছিলো না।

উপরের পয়েন্টগুলো থেকে স্পষ্ট হয় আসরার ওই অনুষ্ঠানে যা পান করেছেন তা অন্য যা কিছুই হোক না কেন, প্রচলিত অর্থে 'বিষ' বা Poison (যা খেলে মৃত্যু অবধারিত) নয়।

Updated On: 2020-04-05T17:04:29+05:30
Show Full Article
Next Story