সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে; এতে দেখা যাচ্ছে বাজারে অভিযান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ ডিম ভেঙে ফেলা হয়েছে। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বাজারে প্লাস্টিকের নকল ডিম ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে এসব ডিম ধ্বংস করছে। এ ধরনের পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে।
গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি 'রাজু ভাই' নামক পেজ থেকে এরকম একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, 'প্লাস্টিকের ডিমে এখন সায়লাব বাংলাদেশের বাজার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হতেই একের পর এক অসাধু ব্যবসায়ী ধরা পড়ছে। বাজারে ছড়িয়ে পড়া এই নকল ডিম সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভেজাল ও ক্ষতিকর ডিম স্বাস্থ্যহানিকর হতে পারে। ক্রেতাদের সচেতনতা ছাড়া এই প্রতারণা রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা বাড়িয়ে ধরা দিচ্ছে অসাধুদের। সুতরাং, বাজারে পছন্দের ডিম কেনার সময় সাবধান থাকা জরুরি।' পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন —
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযানে প্লাস্টিকের ডিম জব্দ ও নষ্ট করে ফেলার ঘটনার ছবি দাবিতে প্রচারিত ছবিটি কোনো বাস্তব ঘটনার নয় বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
সার্চ করে সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে নকল ডিম বা প্লাস্টিকের ডিম পাওয়া এবং নষ্ট করার কোনো সংবাদ গ্রহণযোগ্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
এরপরে, আলোচ্য ছবি থেকে কী-ফ্রেম সার্চ করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ছবিটিতে দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় (বা দিক থেকে) পুলিশ সদস্যের হাতের আঙুলগুলো অস্পষ্ট এবং অস্বাভাবিকভাবে মিশে থাকার মতো অসঙ্গতি পাওয়া যায়। কেননা এআই প্রায়ই মানুষের হাত এবং আঙুলের নিখুঁত গঠন তৈরিতে ভুল করে। এছাড়াও, মেঝেতে থাকা ভাঙা ডিমের স্তূপ এবং কুসুমের রং ও বিন্যাস খুবই কৃত্রিম মনে হয়েছে। কেননা কুসুমের উজ্জ্বল হলুদ রং এবং ডিমের খোসাগুলোর ছড়িয়ে থাকার ধরণ বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত বা প্যাটার্নযুক্ত মনে হচ্ছে।
এআই তৈরি ছবির সমজাতীয় অসঙ্গতি পাওয়ার ফলে ছবিটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল দ্বারা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। নিখুঁত, সীমাবদ্ধতা কম থাকা, সহজলভ্যতা ও ক্ষেত্রবিশেষ বিনামূল্যে হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই তৈরি ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন --
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ ছবিটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য পূর্ববর্তী কোনো বাস্তব দৃশ্যেকে এআই দ্বারা সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন সংস্করণের হুবহু একই ছবি তৈরি করলেও এই ধরণের কনটেন্টকে এআই তৈরি কনটেন্ট এবং এই ধরণের কোনো কনটেন্টে কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত) নকল করার চেষ্টা করা হলে তা ডিপফেক কনটেন্ট হিসেবে গণ্য হয়।
বাজারে কি প্লাস্টিকের ডিম পাওয়া যায়?
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায় - ২০১৭ সালের প্রায় শুরুর দিকে বাজারে নকল প্লাস্টিকের ডিম ছড়িয়ে পড়েছে এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমেও (১, ২, ৩) প্রচার হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি বিভিন্ন বাজার থেকে ডিম সংগ্রহ করে গবেষণা করে প্রকাশিত ফলাফলে (জুন, ২০১৭) জানায় 'বাংলাদেশে নকল ডিমের অস্তিত্ব নেই'। দেখুন --
এছাড়াও সেসময়ে (জুলাই ২০১৭) 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ'ও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিলো- 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তদন্তক্রমে নিশ্চিত হয়েছে যে, প্রতিবেদনসমূহে বর্ণিত তথ্য-উপাত্ত ও মতামত সমূহ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যথাযথ তথ্যপ্রমাণ সমর্থিত নয়। এ ছাড়াও তদন্তক্রমে জানা যায় যে, বাংলাদেশের কোথাও কোন নকল/কৃত্রিম ডিমের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।'
নিজেদের ফেসবুক পেজে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আরেক পোস্টে 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ' উল্লেখ করেছে- 'নকল বা প্লাস্টিকের ডিমের প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বা কেউ দিতে পারে নি'। বিজ্ঞপ্তির ছবি ও পোস্টের স্ক্রিনশটের কোলাজ দেখুন --
দৈনিক যুগান্তরে ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি 'প্লাস্টিকের চাল বা প্লাস্টিকের ডিম বলতে কি কিছু আছে?' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে লেখক রাগিব হাসান উল্লেখ করেছেন - ফেসবুকে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়; বাংলাদেশের একজন ক্রেতা বাজার থেকে ডিম কিনে এনে দেখেছেন ভেতরের কুসুমটা অদ্ভুত হয়ে গেছে। একে প্লাস্টিকের ডিম বলা হচ্ছে। বাংলাদেশের গরমে দোকানে বাইরে ডিম বেশিদিন রাখলে তা পচবেই, আর পচা ডিমের কুসুমও অবধারিতভাবেই ও রকম দেখাবে। খোসার নিচের "প্লাস্টিক" এর মতো দেখতে আবরণটা হলো ডিমের ভেতরে খোসার ঠিক নিচে একটা পাতলা মেমব্রেন বা আবরণ থাকে। ডিম কড়া রোদে বেশিদিন থাকলে সেটা শুকিয়ে কাগজের মতো হতে পারে। তাই বলে তাকে প্লাস্টিক বা কাগজ মনে করাটা ছেলেমানুষি রকমের হাস্যকর। (সংক্ষেপিত)।
তিনি আরও উল্লেখ করেন- 'একই ঘটনা প্লাস্টিকের চালের ক্ষেত্রেও চলে। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম একজন ভাত রান্না করার পরে ভাতের চেহারা দেখে বলছেন এটা নির্ঘাত প্লাস্টিকের চাল। ভাতের মাড় নাকি শুকিয়ে প্লাস্টিকের মতো হয়ে গেছে, আর ভাতটাকে বল বানিয়ে বাউন্স করানো যাচ্ছে। পোস্টদাতা কি কখনো ভাতের মাড় শুকানোর পরে কেমন হয় দেখেননি? চাল পুরনো হলে পচতে পারে বটে, আর সেই পচা চালের মাড় নানা অবস্থায় হাঁড়ির গরমে পড়ে প্লাস্টিকের মতো চেহারা হতে পারে বটে।'
প্লাস্টিক না হলে ভাতের বল বাউন্স করে কিভাবে এমন বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন- 'ভাত মূলত কার্বহাইড্রেট, আর ভাতের স্থিতিস্থাপকতা অনেক সময়ে বরাবরের মতো হওয়া সম্ভব পদার্থবিজ্ঞানের সব নিয়ম মেনেই। তার জন্য প্লাস্টিক হওয়ার দরকার নেই। কাজেই ভাতের বল বাউন্স করলেই সেটা প্লাস্টিক হওয়ার প্রমাণ নয় মোটেও। '
অর্থনৈতিক কারণেও বাজারে প্লাস্টিকের ডিম পাওয়া অসঙ্গতিপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন - 'এক কেজি চালের খুচরা দাম কত? ৬০ টাকা? ১০০ টাকা? আর এক কেজি প্লাস্টিকের দাম কত? মোটামুটি নিম্নমানের ১ কেজি প্লাস্টিকের দাম কোনো অবস্থাতেই ১৫০-২০০ টাকার কম হবে না (আমেরিকার বাজারে প্লাস্টিকের পাইকারি দাম দেখে বললাম)। আর সেই প্লাস্টিক কাঁচামালকে দিয়ে চাল বানিয়ে সেই চাল চীন থেকে বাংলাদেশে জাহাজে বা স্থলপথে আমদানি করে এবং বেশ কয়েকজন মধ্যস্বত্বভোগী পেরিয়ে মুদির দোকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা কখনোই ২০০-৩০০ টাকা কেজির কমে দেয়া সম্ভব না। সেই অবস্থায় কীভাবে ক্রেতা সেটা ৬০ টাকা কেজিতে কিনতে পারবেন?
একই যুক্তি খাটে ডিমের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের বাজারে একটা ডিমের দাম ৮ টাকার মতো। এখন ভেবে দেখুন, একটা নকল ডিম বানাতে যা লাগে, সেটা কয়েক হাজার মাইল দূরে চীন থেকে বাংলাদেশে রফতানি করার খরচসহ ৮ টাকার কমে কি দেয়া সম্ভব? দোকানদার আপনাকে ৮ টাকায় একটা ডিম বেচলে অবশ্যই লাভ রেখে বিক্রি করছে। কাজেই তার কেনা দাম ৮ টাকার অনেক কম। তাই হিসাবটা কি মিলে? দুনিয়ার সব ডিম ব্যবসায়ীরা কি অনেক টাকা লস দিয়ে নকল ডিম বিক্রি করবে, যেখানে আসল ডিম সস্তায় মুরগির কাছ থেকে পাওয়া যায়?'
একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট 'বিজ্ঞানচিন্তা'য় প্রকাশিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা এম আব্দুল মোমিনের লেখায়ও।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে বাস্তব দৃশ্যের বলে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি বাস্তব ঘটনার ছবি হিসেবে বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।




