জামায়াত নেতার খাটের নিচে তেল পাওয়ার দাবিতে এআই ছবি প্রচার
বুম বাংলাদেশ দেখেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে টুলটি ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে; এতে দেখা যাচ্ছে একটি খাটের নিচে সারি সারি প্লাস্টিকের বোতলে জ্বালানি তেল সদৃশ তরল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পোস্ট করে বলা হয়েছে, দেশে পেট্রোল সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে এক শিবির নেতার। তার বাসায় তল্লাশি করে খাটের তলায় মজুদ করা তেল পাওয়া গেছে। এ ধরনের পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে।
মধ্যপ্রাচ্য ও হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে অনিশ্চয়তা, চাপ ও দাম বৃদ্ধি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির সূচি ও বিলম্বকে বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৭ মার্চ 'Masud R Rahman - মাসুদ আর রহমান' নামক পেজ থেকে এরকম একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টটির স্ক্রিনশট দেখুন--
ফ্যাক্ট-চেক:
বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি বাস্তব নয় মূলত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। গুগলের SynthID ডিটেকশন টুলে ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করেছে।
আলোচ্য ছবিটি রিভার্স সার্চ সহ বিভিন্নভাবে সার্চ করে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ছবিটি পর্যবেক্ষণে কয়েকটি অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
খাটের বাম পাশে থাকা সৈনিকটির হাতের আঙুল ও কব্জির গঠন প্রাকৃতিকভাবে সঠিক নয় এবং বেশ অস্পষ্ট। এছাড়া, পেছনের মানুষগুলোর চেহারা ঝাপসা ও বিকৃত দেখায়। ছবির মাঝখানে টর্চলাইটের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকলেও, আসবাবপত্র বা মানুষের শরীরের ওপর পড়া আলো ও ছায়া সেই আলোর উৎসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণত এআই তৈরি ছবিতে এমন অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
ছবিটিতে এআই–সৃষ্ট অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ফলে ছবিটিকে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী একটি টুল দিয়ে আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। নিখুঁত ফলাফল, তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতা, সহজলভ্যতা ও বিনামূল্যের হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এআই দিয়ে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গুগলের জেনারেটিভ টুল 'জেমিনি (Gemini)' ব্যবহারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেমিনির ২.৫ ফ্ল্যাশ বা তার চেয়ে উন্নত মডেলে (ছবির ক্ষেত্রে ন্যানো ব্যানানা বলা হয়) আগের চেয়েও বেশি বাস্তবের ন্যায় যে কোনো ধরনের ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana) হলো গুগল-এর Gemini 2.5 Flash Image মডেলটির কোডনেম বা অভ্যন্তরীণ ডাকনাম। এই মডেলটি মূলত একটি উন্নত এআই ইমেজ এডিটিং মডেল যা টেক্সট কমান্ড বা বর্ণনা ব্যবহার করে ছবি তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে। সর্বশেষ হালনাগাদে জেমিনির মডেলগুলোকে আরো উন্নত করা হয়েছে। এদিকে, গুগলের জেনারেটিভ টুলগুলো তাদের ইমেজ কনটেন্ট সাধারণ ওয়াটারমার্কিংয়ের পাশাপাশি 'SynthID' নামক এক ধরনের ওয়াটারমার্কিং ব্যবহার করে যা খালি চোখে শনাক্ত করা যায় না। তবে গুগলের SynthID ডিটেকশন টুল সেটি শনাক্ত করতে পারে।
পরবর্তীতে, ছবিটি জেমিনি টুল দিয়ে তৈরি কিনা নিশ্চিত হতে গুগলেরই SynthID ডিটেকশন টুলে এটিকে যাচাই করা হয়েছে। এই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি যাচাই করলে 'গুগলের এআই ইমেজ জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে' বলে ফলাফল দিয়েছে এবং ছবিতে SynthID শনাক্ত করেছে। দেখুন —
এখানে নীল চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে এআই এর লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে (Detected)। এছাড়াও, ধূসর চিহ্নিত অংশের জায়গাতে টুলটি সরাসরি ওয়াটারমার্ক পায়নি তবে সম্ভাবনা রয়েছে (Unsure) এবং কমলা চিহ্নিত অংশের অর্থ হলো এই জায়গাতে ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি (Not detected)। তবে কোনো ছবির কোনো একটি অংশে এই লুকোনো ওয়াটারমার্ক পাওয়ার অর্থ হলো ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি অথবা সম্পাদিত। যে যে অংশগুলোতে ধূসর ও কমলা দেখা যাচ্ছে সেই অংশগুলোর ওয়াটারমার্ক সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিংবা সম্পাদনার কারণে মুছে যেতে পারে ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ আলোচ্য ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা তৈরি।
সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত নেতার বাসায় তেলের মজুদ পাওয়া গেছে মর্মে যে ছবি প্রচার করা হয়েছে সেটি বাস্তব ছবি নয়।




